chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

লিগ্যাল এইডের মানবিক স্পর্শে বিজ্ঞানের আলোয় ঘুচল অন্ধকার

একটি ডিএনএ টেস্ট ও বুকে টেনে নেওয়া বাবার গল্প

“তুই আমার ছেলে না!”  বাবার মুখ থেকে আসা এই একটি বাক্যই ওলটপালট করে দিয়েছিল এক যুবকের জীবন। জন্মদাতার এমন অমোঘ অস্বীকৃতি বুকে নিয়ে যে যুবকের প্রতিটি দিন কেটেছে এক নিঃশব্দ কান্নার ইতিহাসে, দীর্ঘ ২৭ বছর পর অবশেষে তার জীবনের অমাবস্যা কেটেছে। বিজ্ঞান আর আইনের এক অপূর্ব মানবিক মেলবন্ধনে ঘুচেছে তার পিতৃপরিচয় পাওয়ার আজন্ম আকুতি। চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের চার দেয়ালের ভেতরে সম্প্রতি রচিত হলো এক ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগার মহাকাব্য।

ইতিহাসের পাতাটা উল্টানো যাক ২৭ বছর পেছনে। তখন আশরাফ উদ্দিন নামের এই যুবকের বয়স কেবল কয়েক মাস। পৃথিবীর আলো-বাতাস চেনার আগেই তার জীবনের আকাশ মেঘে ঢেকে যায়। বাবা সুদূর প্রবাসে, আর দেশে মা-বাবার মধ্যে শুরু হয় সম্পর্কের চরম টানাপোড়েন। একপর্যায়ে তাদের স্থায়ী বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। মা যখন অন্য সংসারে চলে যান, তখন আক্ষরিক অর্থেই মাঝদরিয়ায় ভেসে যায় কয়েকমাসের নিষ্পাপ শিশু আশরাফ।

 

শৈশব থেকেই পৈতৃক স্নেহ থেকে বঞ্চিত ছিলেন আশরাফ। মায়ের কোল নেই, বাবার আশ্রয় নেই—এক প্রকার এতিম হয়েই মামার বাড়িতে অন্যের দয়ায় বড় হতে থাকেন তিনি। প্রতিটি ঈদে, প্রতিটি উৎসবে যখন অন্য শিশুরা বাবার হাত ধরে নতুন জামা কিনতে যেত, আশরাফের চোখ তখন আড়ালে জল ফেলত। উৎসবের আলোতেও তার চারপাশটা ছিল বড্ড অন্ধকার।

১০ বছর বয়সে আশরাফ বাবার বাড়িতে ফিরে এসে প্রায় পাঁচ বছর কাটান। কিন্তু বাবার মনে ছিল গভীর সন্দেহ আর অবিশ্বাস‘এই কি তার সন্তান?’। আশরাফ বলেন, “বাবা আমাকে কখনোই মন থেকে মেনে নেননি। আদর করতেন না বললেই চলে।” পরবর্তীতে এক ফুফুর স্বামী তাকে শহরে নিয়ে আসেন গ্রিল ওয়ার্কশপের কাজ শেখানোর জন্য। এরপর ২০২৪ সালে আশরাফ যখন আবারও বাড়ি ফিরতে চান, তখন বাবা তাকে পুরোপুরি অস্বীকার করে বসেন।

অবহেলা আর সমাজের বাঁকা চাহনি সহ্য করতে করতে ক্লান্ত আশরাফ নিজের অধিকার ও পিতৃপরিচয় প্রতিষ্ঠার এক অদম্য জেদ বুকে চেপে ধরেন। ২০২৪ সালে তিনি সহায়হীনদের শেষ আশ্রয়স্থল চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সিভিল জজ) সুব্রত দাশের আমন্ত্রণে যখন দীর্ঘ এত বছর পর বাবা ও পুত্র মুখোমুখি হলেন, তখনো বাবার চোখে ছিল অবিশ্বাসের মেঘ। বাবা সাফ জানিয়ে দিলেন, “ডিএনএ টেস্টের পজিটিভ রিপোর্ট ছাড়া আমি একে সন্তান বলে স্বীকৃতি দেব না।”

পিতৃত্ব প্রমাণের এই কঠিন ও ব্যয়বহুল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা ওই একাকী শ্রমজীবী যুবকের পক্ষে ছিল অসম্ভব। কিন্তু তার এই শূন্য হাতে সাহস জোগায় লিগ্যাল এইড কর্তৃপক্ষ। ২০২৬ সালে এসে লিগ্যাল এইড অফিসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও দুজন প্যানেল আইনজীবীর নিরলস লড়াইয়ের পর মা, বাবা ও সন্তানের ডিএনএ টেস্টের ব্যবস্থা করা হয়।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে যখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ডিএনএ টেস্টের চূড়ান্ত সিলমোহরযুক্ত খামটি খোলা হলো, তখন ঘরের ভেতরের পরিবেশ ছিল থমথমে। অবশেষে বিজ্ঞান তার অকাট্য রায় জানিয়ে দিল—৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ জৈবিক মিল! বিজ্ঞান প্রমাণ করল, আশরাফই ওই প্রবাসীর নিশ্চিত সন্তান।

রিপোর্টের সত্যতা প্রকাশের পর বাবার চোখের সামনে থেকে যেন দীর্ঘ ২৭ বছরের ভুল ও সন্দেহের পর্দা এক নিমেষে সরে গেল। নিজের ভুল স্বীকার করে আর এক মুহূর্তও দেরি করেননি পিতা। পরম মমতায়, দুচোখের অশ্রু বিসর্জন দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সন্তানকে বুকে টেনে নেন। যে বুকের ওম থেকে দীর্ঘ ২৭ বছর বঞ্চিত ছিলেন আশরাফ, সেই বুকেই মিলল জীবনের পরম শান্তি। বাবার চোখের জল আর সন্তানের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছিল লিগ্যাল এইড অফিসের বাতাস।

আপস-মীমাংসার শর্তানুযায়ী, গত মঙ্গলবার থেকেই আশরাফ তার পিতার নিজ বাসভবনের নিচতলার একটি কক্ষে বসবাস শুরু করেছেন। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পর অবশেষে বাবার ঘরের চাবি আজ সন্তানের হাতে। টাকা-পয়সা বা সম্পত্তির চেয়েও আশরাফের কাছে বড় ছিল সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অধিকার, যা আজ পূর্ণতা পেয়েছে। আগামী শুক্রবার জুমার নামাজের পর স্থানীয় মসজিদে এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে আশরাফকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের সন্তান হিসেবে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেন পিতা। একই সাথে সন্তানের যাবতীয় বৈধ উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির অধিকারও বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

বিদায়বেলায় লিগ্যাল এইড অফিসের পক্ষ থেকে পিতা ও পুত্রকে শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে টি-শার্ট প্রদান করা হয়। অত্যন্ত আবেগআপ্লুত কণ্ঠে জেলা লিগ্যাল এইডের সহকারী মোহাম্মদ এরশাদুল ইসলাম বলেন, “বিনামূল্যে সরকারি আইনি সহায়তার মাধ্যমে একটি ভাঙা পরিবারের পুনর্মিলন ঘটাতে পারা এবং একজন যুবকের দীর্ঘ ২৭ বছরের পিতৃপরিচয় ফিরিয়ে দিতে পারা আমাদের আইনি সেবার অন্যতম বড় সার্থকতা। আইন শুধু শাস্তি দেয় না, আইন এভাবেও জীবনকে রাঙিয়ে দিতে পারে।”

২৭ বছরের দীর্ঘ অন্ধকার আর অবহেলার পর অবশেষে আশরাফের জীবনে ফিরেছে কাঙ্ক্ষিত আলো। এই গল্প শুধু একটি আইনি জয়ের নয়, এটি বিজ্ঞান, আইন এবং মানবিকতার এক অনন্য বিজয়ের দলিল।

এই বিভাগের আরও খবর