chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

মানুষ যে কারণে প্রেমে পড়ে

মন কি আসলেই অবুঝ, নাকি পেছনে আছে বিজ্ঞান?

প্রেমে পড়ার নাকি কোনো ব্যাখ্যা হয় না। যুগের পর যুগ ধরে প্রচলিত এই রোমান্টিক ধারণাকে হয়তো কবি-সাহিত্যিকরা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন। কিন্তু বিজ্ঞান কী বলে? ভালোবাসার রসায়নে সম্পর্কে জড়ানো মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি। মানুষ আসলে ঠিক কী কারণে অন্য একজন মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং প্রেমের সম্পর্কে জড়ায়, তা নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই।

সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের মনস্তত্ত্ববিদ ও বিবর্তনীয় বিজ্ঞানীদের নানান গবেষণায় এর পেছনে মূল কিছু কারণ উঠে এসেছে, যা বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সাইকোলজি টুডে’ এবং ‘জার্নাল অব পার্সোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি’তে প্রকাশিত হয়েছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, মনোবিজ্ঞানীদের চোখে মানুষ ঠিক কী কারণে প্রেমে পড়ে।

বিজ্ঞান সাময়িকী সাইকোলজি টুডে’তে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে কানাডার মনস্তত্ত্ববিদ ও গবেষক ডা. ম্যাকডোনাল্ড এবং তার সহযোগীরা মানুষের সম্পর্কে জড়ানোর পেছনে দুটি মূল ধারা খুঁজে পেয়েছেন:

সহজাত আনন্দ,

মানুষ মূলত সম্পর্ককে ভেতর থেকে উপভোগ করে। এর মধ্যে এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি পায় বলেই অবচেতনভাবে সে সঙ্গী খোঁজে।

সামাজিক পারিবারিক চাপ

অনেকের ক্ষেত্রে সম্পর্কের কারণটি পুরোপুরি নিজের ভেতর থেকে আসে না। পরিবার বা বন্ধুদের খুশি করা কিংবা সমাজ কী ভাববে— এমন বাহ্যিক চাপও মানুষকে সম্পর্কে জড়াতে বাধ্য করে।

মনস্তাত্ত্বিক সাদৃশ্য একই মানসিকতা

আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) প্রকাশিত ‘জার্নাল অফ পার্সোনালিটি অ্যান্ড সোশাল সাইকোলজি’র একটি গবেষণায় মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ডোনেল বার্ন এবং ডি. নেলসন দেখিয়েছেন মানুষের আকর্ষণের মূল উৎস। তাদের ‘অ্যাট্রাকশন থিওরি’ অনুযায়ী মানুষের চিন্তাভাবনা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং জীবনযাত্রার মধ্যে যত বেশি মিল বা সাদৃশ্য থাকবে, তাদের মধ্যে অবচেতনভাবে প্রেমের আকর্ষণ তত তীব্র হবে। অর্থাৎ, “বিপরীত মেরু আকর্ষণ করে” এই ধারণার চেয়ে “একই মানসিকতা” প্রেমে পড়ার ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর।

উত্তেজনা পরিস্থিতির ভুল ব্যাখ্যা!

অনেক সময় বিশেষ কোনো পরিস্থিতি মানুষকে দ্রুত সম্পর্কে জড়াতে উদ্বুদ্ধ করে। কানাডার মনোবিজ্ঞানী ডোনাল্ড ডাটন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী আর্থার আরন এক যৌথ গবেষণায় দেখিয়েছেন এক অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব।

ভয় বা উত্তেজনা থেকে প্রেম: কোনো রোমাঞ্চকর বা ভীতিজনক পরিস্থিতিতে (যেমন- রোলার কোস্টারে চড়া বা বিপজ্জনক পথ পার হওয়া) মানুষের হৃদস্পন্দন যখন বেড়ে যায়, তখন মস্তিষ্ক সেই শারীরিক উত্তেজনাকে সামনের মানুষটির প্রতি ‘আকর্ষণ বা প্রেম’ হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করে বসে। আর এই ভুল সংকেতের কারণেই মানুষ দ্রুত প্রেমে পড়ে যায়!

হরমোনের খেলা মস্তিষ্কেররিওয়ার্ড সার্কিট

যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের নিউরোবায়োলজিস্টদের মতে, প্রেম আসলে মস্তিষ্কের একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া। মানুষ যখন কারও প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করে, তখন মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সার্কিট’ বা পুরস্কার পাওয়ার কেন্দ্রটি সক্রিয় হয়ে ওঠে।

ডোপামিন: কারও প্রতি ভালোলাগা তৈরি হলে মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোন নিঃসরণ বাড়ে, যা তীব্র আনন্দ ও উত্তেজনার অনুভূতি তৈরি করে।

অক্সিটোসিন: অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কে একে অপরের প্রতি বিশ্বাস ও নিবিড়তা তৈরি করে ‘লাভ হরমোন’ নামে পরিচিত অক্সিটোসিন।

বিশেষজ্ঞদের এই সমস্ত বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, সম্পর্কের শুরুটা শারীরিক বা বাহ্যিক আকর্ষণ দিয়ে হলেও, মানুষ মূলত মনস্তাত্ত্বিক সাদৃশ্য, নিজের অভ্যন্তরীণ আনন্দ এবং এক ধরণের মানসিক ও জৈবিক নিরাপত্তার তাগিদেই একে অপরের প্রেমে পড়ে। প্রকৃতিগতভাবেই মানুষ এমন এক সামাজিক সত্তা, যা অন্যের সঙ্গে মানসিক বন্ধনে আবদ্ধ না হয়ে সম্পূর্ণ হতে পারে না। তাই প্রেমে পড়াটা যতটা আবেগের, ঠিক ততটাই বিজ্ঞানের!

মুন্নি/চখ

এই বিভাগের আরও খবর