chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

সন্ধ্যার আলো নিভলেই কি নিভে যাবে বন্দরনগরীর দীর্ঘশ্বাস

দিনশেষে যখন সূর্যের তপ্ত আলো ম্লান হয়ে আসে, ঠিক তখনই প্রাণ ফিরে পায় চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী টেরিবাজার কিংবা রিয়াজুদ্দিন বাজার। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের পাইকারি আড়ত থেকে শুরু করে স্যানমার ওশান সিটির কাঁচের দেয়াল সবখানেই সন্ধ্যার পর শুরু হয় কেনাকাটার আসল ধুম। কিন্তু সেই চেনা ব্যস্ততার মুখে আচমকাই যেন অন্ধকার নেমে আসার উপক্রম। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধের সরকারি নির্দেশনায় এখন বন্দরনগরীর ব্যবসায়ী মহলে বইছে চাপা কান্না আর চরম ক্ষোভের ঝড়।

ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন যেখানে তীব্র গরমে দিনে মানুষ ঘর থেকেই বের হতে চায় না, সেখানে সন্ধ্যার ঠিক মোক্ষম সময়ে আলো নিভিয়ে দিলে তারা বাঁচবেন কী করে?

ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের কোনো বড় ব্যাংক ঋণ নেই, নেই কোনো সরকারি অনুদান। প্রতিদিনের উপার্জনেই চলে তাদের সংসার, কর্মচারীদের বেতন। রিয়াজউদ্দিন বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি ছালামত আলী বুকভরা ক্ষোভ আর আকুতি নিয়ে বলেন, ব্যবসা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এই ব্যবসায়ীরাই বছরে মোটা অঙ্কের ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে সরকারের আয়ের পথ সচল রাখে। আমরা সরকারের শত্রু নই, বন্ধু হয়ে পাশে থাকতে চাই। কিন্তু ১ জুন থেকে যে আদেশ আবার দেওয়া হয়েছে, তা আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। সরকারের উচিত এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা।
গত ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় চট্টগ্রামের বাজারে কেনাকাটা প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। সেই মন্দার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন এই নির্দেশনা যেন ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’।

ঐতিহ্যবাহী টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুল মান্নান ঈদের পর শপিংমল খোলার দিনে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, বাস্তবতা হলো, চট্টগ্রামের প্রায় ৬০ শতাংশ ক্রেতাই সন্ধ্যার পর কেনাকাটা করতে আসেন। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ বিকেলে রওনা দিয়ে সন্ধ্যায় পৌঁছায়। ৭টার মধ্যে যদি ঝাঁপ বন্ধ করতে হয়, তবে আমাদের ব্যবসা বলতে আর কিছুই থাকবে না। দেশের লাখো মানুষের জীবিকা এই খুচরা ব্যবসার সাথে জড়িত কর্মচারী, সরবরাহকারী, ভ্যানচালক সবার ঘরেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ব্যবসায়ীদের মনে বড় ক্ষোভের জায়গাটি হলো বৈষম্য। বড় বড় ক্লাব, বিনোদন কেন্দ্র ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যখন গভীর রাত পর্যন্ত এসি চলে, আলোকসজ্জা হয়, তখন কেন শুধু খেটে খাওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপরই বারবার কোপ পড়ে? যেখানে সরকারি রেকর্ড বলছে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, সেখানে কেন এই অন্ধকার নেমে আসবে শুধু বাজারের দোকানগুলোতে? চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের মূল সংকট ও দাবি ৬০ শতাংশ ক্রেতাই আসেন সন্ধ্যার পর। তাই সকালের বদলে দুপুর ১২টা থেকে শপিংমলগুলো রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা রাখার সুযোগ দেয়া উচিৎ। দিনে তীব্র গরম ও কর্মব্যস্ততার কারণে মানুষ রাতেই বেশিরভাগ শপিং করতে আসে। এছাড়া বিভিন্ন ক্লাব ও সরকারি খাতে আলোকসজ্জাগুলো নিয়ন্ত্রনে এনে শপিংমলকে সুযোগ দেয়া উচিৎ।
বন্দরনগরীর অর্থনৈতিক ঐতিহ্য এবং লাখো মানুষের রুটি-রুজির কথা বিবেচনা করে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতাদের একটাই আকুল দাবি বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। সকালের ঘুমন্ত শহরের দোকান বন্ধ রেখে দরকার হলে দুপুর ১২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ব্যবসা করার অনুমতি দেওয়া হোক। আলো জ্বলুক চট্টগ্রামের বাজারে, সচল থাকুক হাজারো পরিবারের বেঁচে থাকার স্বপ্ন।

এই বিভাগের আরও খবর