হাদি হত্যা প্রসঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন সব জানি
বিজেপির কাছে তৃণমূলের বড় ব্যবধানে পরাজয়ের প্রায় এক মাস পর মঙ্গলবার কোলকাতায় প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি এই চাঞ্চল্যকর দাবি করেন
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি হত্যার ঘটনায় ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামিদের নাম গোপন রাখতে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্বয়ং নিজে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন বলে বিস্ফোরক দাবি করেছেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কাছে তৃণমূলের বড় ব্যবধানে পরাজয়ের প্রায় এক মাস পর মঙ্গলবার কোলকাতায় প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি এই চাঞ্চল্যকর দাবি করেন।
কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলার ‘ওয়াই চ্যানেল’-এ ভোট পরবর্তী পরিস্থিতি, পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ, নিট পরীক্ষার জালিয়াতি ও বিজেপি সরকারের প্রতিহিংসামূলক আচরণের প্রতিবাদে এই ধরনা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সেখান থেকেই বাংলাদেশের আলোচিত ওসমান হাদি হত্যার প্রসঙ্গ টেনে এনে মোদি-শাহ সরকারকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করান মমতা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি করেন, হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল আসামিদের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) গ্রেপ্তার করার পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাকে নিজে ফোন করে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য চাপ দেন।
সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “বাংলাদেশ থেকে একটা বড় খুনিকে রাজ্য পুলিশের এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল। যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক রেভ্যুলেশন হয়েছিল। অন্য দেশের কথা আমি বলছি না। আমার অধিকারও নেই বলার। কিন্তু আমি যেটা বলতে চাইছি তা হলো ওই হত্যাকারীরা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে বাংলায় চলে আসে। বাংলায় আসার পর আমাদের এসটিএফ তাদের ধরে। এইটা তাদের কৃতিত্ব।”
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, “কিন্তু তারপর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে আমাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, আপনি রাজ্য পুলিশকে জানিয়ে দিন এটি যেন বাইরে না যায়। কারণ এটি দেশের ব্যাপার।”
অমিত শাহকে সরাসরি নিশানা করে মমতা প্রশ্ন ছুড়ে দেন, “কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? আজকের সরকার পরিবর্তন হলেও আমি সবটাই জানি। আমার হৃদয়টাই একটা কথার ভাণ্ডার, তথ্যের ভাণ্ডার, সত্যের ভাণ্ডার।”
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে নিজের আবেগের কথা জানিয়ে তৃণমূল নেত্রী বলেন, “এতদিন আমি বলিনি। কিন্তু আজকে অত্যাচারের শেষ সীমায় গেছে বলে আমাকে মুখ খুলতে হয়েছে। আমি সেই নামটা বলতে চাইছি না। বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে। আমি দেশকে ভালোবাসি। দেশের স্বার্থে ওই নাম আমি বলব না।”
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজ শেষে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা অবস্থায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও কট্টর ভারত-অধিপত্যবাদ বিরোধী তরুণ নেতা শরীফ ওসমান হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় মোটরসাইকেল আরোহী সন্ত্রাসীরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
এই হত্যাকাণ্ডের পর পুরো বাংলাদেশে তীব্র ক্ষোভ ও ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এই হামলাকে ‘বাংলাদেশের অস্তিত্ব এবং গণতান্ত্রিক যাত্রার ওপর পরিকল্পিত আঘাত’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং পরবর্তীতে ইনকিলাব মঞ্চ এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত জাতিসংঘের অধীনে করার দাবি জানায়।
বাংলাদেশ পুলিশের তদন্ত ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযোগপত্র অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন সাবেক এক বিতর্কিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর। ওসমান হাদিকে সরাসরি রিকশায় গুলি করেছিলেন ফয়সাল করিম মাসুদ এবং মোটরসাইকেল চালিয়ে তাকে সহযোগিতা করেছিলেন আলমগীর হোসেন। ঘটনার পরপরই খুনিরা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে।
পরবর্তীতে ফিলিপ নামের এক মানব পাচারকারীর সহায়তায় ফয়সাল করিম এবং আলমগীর হোসেন বাংলাদেশের সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে সেখান থেকে ছদ্মবেশে তারা পশ্চিমবঙ্গের একটি সীমান্তসংলগ্ন গ্রামে আত্মগোপন করেন।
গত ৮ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ শাখা (এসটিএফ) অভিযান চালিয়ে এই দুই মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে এই মামলাটি আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক অপরাধ দমন পাক্ষিকের আওতায় এনে বাকি নেপথ্য নায়কদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
যা বলল ইনকিলাব মঞ্চ
মমতা বন্দোপাধ্যায়ের মন্তব্যের পর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র আবদুল্লাহ আল জাবের এক ফেসবুক পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “শহিদ ওসমান হাদির খুনে ভা*রত জড়িত এইটা খুবই স্পষ্ট। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী লুকাচ্ছেন বা কাকে লুকাচ্ছেন এইটাই এখন জানবার বিষয়!”
“কার নাম প্রকাশ হলে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে উঠবে, আমরা জানতে চাই!”
জাবের লেখেন, “এর উত্তর বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। এইখানে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”
ফরিদা|চখ
