সৌদি আরব থেকে তেল নিয়ে জাহাজ এলো চট্টগ্রামে
সৌদি আরব থেকে এক লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে অবসান হতে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির দীর্ঘ ২২ দিন ধরে চলা কাঁচামাল সংকট। আগামী ৭ মে থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারি পুনরায় পূর্ণোদ্যমে উৎপাদন শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ২০ এপ্রিল সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ছেড়ে আসা তেলবাহী জাহাজ ‘এমটি নিনেমিয়া’ বুধবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দরের কুতুবদিয়া নোঙর এলাকায় পৌঁছায়। জাহাজ থেকে তেল খালাসের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে, যা শেষ করতে ৯ থেকে ১০ দিন সময় লাগতে পারে।
বর্তমানে নোঙর করা বড় জাহাজ থেকে ছোট ছোট লাইটার জাহাজের মাধ্যমে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে। মোট আটটি লাইটার জাহাজ এই তেল পতেঙ্গার ডলফিন জেটিতে নিয়ে আসবে। সেখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ইস্টার্ন রিফাইনারির স্টোরেজ ট্যাংকে পাঠানো হবে।
এই তেল পরিবহনের দায়িত্ব পালন করছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)।
ইস্টার্ন রিফাইনারির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্টোরেজ ট্যাংকে তেল পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উৎপাদন শুরু করা সম্ভব। প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, বুধবার তেল হাতে পেলে বৃহস্পতিবার থেকেই উৎপাদন শুরু হবে। তিনি জানান, অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করতে প্রায় ১২ ঘণ্টা সময় লাগে। এই শোধনাগারটি প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল উৎপাদন করতে সক্ষম।
অপরিশোধিত তেলের অভাবে গত ১৪ এপ্রিল ইস্টার্ন রিফাইনারির তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এতে অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল এবং ফার্নেস অয়েলসহ প্রতিদিন ৪ হাজার মেট্রিক টনের বেশি জ্বালানি উৎপাদন বন্ধ থাকে। তবে তিন নম্বর ইউনিটটি আংশিকভাবে চালু ছিল যা সীমিত পরিমাণে বিটুমিন, পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদন করেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) মনে করছে, তেলের এই নতুন চালান দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বিপিসি পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে বাজার স্বাভাবিক রেখেছে। বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মো. ফেরদৌসী মাসুম হিমেল জানান, বর্তমানে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে এবং কোনো সংকটের ঝুঁকি নেই। তিনি বলেন, পরিশোধিত তেলের আমদানি বাড়িয়ে বাজারের ঘাটতি মেটানো হয়েছে। নতুন করে অপরিশোধিত তেল আসায় মজুত আরও শক্তিশালী হয়েছে।
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, নতুন আসা এই তেল থেকে প্রায় ২৬ হাজার টন ডিজেল, ২৪ হাজার টন ফার্নেস অয়েল, ১৬ হাজার টন পেট্রোল, ২১ হাজার টন কেরোসিন এবং ৮ হাজার টন অকটেন পাওয়া যাবে। কর্মকর্তারা জানান, এই পরিমাণ তেল দিয়ে শোধনাগারটি প্রায় ২৫ দিন চলতে পারবে। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পরবর্তী চালানগুলো সঠিক সময়ে আসা জরুরি।
এদিকে আগামী ১০ মে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর থেকে আরও এক লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে আরেকটি জাহাজ রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। জাহাজটি ২৫ মে নাগাদ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পারে। আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা বিবেচনা করে এই বন্দরটি নির্বাচন করা হয়েছে।
এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি অপরিশোধিত তেলের শেষ চালানটি এসেছিল। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনার কারণে সৌদি আরবের রাস তানুয়রা বন্দরে একটি জাহাজ আটকে যাওয়ায় সম্প্রতি এই সরবরাহ সংকট তৈরি হয়।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ তার চাহিদার বড় একটি অংশ পরিশোধিত আকারে আমদানি করে যার মধ্যে ডিজেলের পরিমাণ প্রায় ৬৯ শতাংশ। বাংলাদেশ বছরে ১২ থেকে ১৫ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, যার অর্ধেকের বেশি আসে সৌদি আরব থেকে। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইস্টার্ন রিফাইনারি বর্তমানে দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পূরণ করে থাকে।
ফরিদা|চখ
