বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিচ্ছে চট্টগ্রামের শুঁটকি
কথায় বলে ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। মাছ প্রেমে বাঙালির জুড়ি মেলা ভার। শুটকি মাছের জনপ্রিয়তাতো আলাদা–ই। খুব কম বাঙালিকেই খুঁজে পাওয়া যাবে, যাদের শুটকি মাছের নাম শুনলে জিভে জল আসে না। বাংলাদেশের শুটকির বড় অংশ উৎপাদিত হয় চট্টগ্রাম বিভাগের কয়েকটি জেলায়। বন্দর নগরী চট্টগ্রাম শুটকির জন্য বিখ্যাত এতো সবার জানা কথা।
সারাদেশে কমবেশি শুঁটকি উৎপাদন হলেও দেশজুড়ে আলাদা কদর রয়েছে চট্টগ্রামে উৎপাদিত শুঁটকির। স্বাদে-গন্ধে অনন্য এ শুঁটকি মিশে আছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের সঙ্গে।
উৎপাদিত শুঁটকি দেশের চাহিদা মিটিয়ে পাঠানো হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশেও। শুঁটকির পাইকারি বাজার আছাদগঞ্জের ব্যবসায়ীদের কাছে ক্রমান্বয়ে চট্টগ্রামের শুঁটকি হয়ে উঠছে সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত।

চট্টগ্রামে উৎপাদিত শুঁটকির মুখরোচক স্বাদ যেন প্রকৃতির অকৃপণ ঐশ্বর্য। ভোজনরসিক বাঙালি চট্টগ্রামের শুটকির মুখরোচক স্বাদের সঙ্গে সহজেই তফাৎ খুঁজে নিতে পারেন অন্য শুঁটকির। এ শুঁটকির সুখ্যাতি রয়েছে দেশি-বিদেশি অতিথিদের ভোজনবিলাসেও।
নগরীর বাকলিয়া ও ডাঙ্গারচর শুঁটকি পল্লীতে সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, বাকলিয়া থানা বাস্তুহারা এলাকার কর্ণফুলীর তীরেই ৯৮একরের বিশাল শুঁটকি পল্লিতে ১২০টি মাচাং এ শুকানো হচ্ছে শুঁটকি।
এ পল্লীতে প্রতিদিন গড়ে ৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন বলে এখানকার শুঁটকি উৎপাদনকারীরা জানান। এখানে শুঁটকি শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা যার যার মত ব্যস্ত সবাই। যেন দম ফেলার ফুসরত নেই কারো।
সেখানেই একটি আড়তে নারী শ্রমিক হিসাবে নিয়োজিত আছেন রাশেদা খাতুন (৩৫)।
তিনি জানান, সূর্য ওঠার পর সেই ভোর থেকেই কর্মব্যস্ততা শুরু হয়। আর সূর্য ডোবা পর্যন্ত এভাবে চলে। পাশের আড়তে রাবেয়া খাতুন বলেন, সারাদিন কাজ শেষে মজুরি পাব তিনশ’ টাকা। আর তা দিয়েই চলে সংসার। শুধু ছখিনা-রাবেয়া নয়, তাদের মত দুই হাজারের বেশি নারীসহ প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিকের আয়-রোজগারের উৎস চট্টগ্রামের এই শুঁটকির আড়তগুলো।
ইসহাক নামের একজন শ্রমিক বলেন, শুকাতে দেওয়ার আগে কাঁচা মাছগুলোর মধ্যে যেসব মাছ ছোট সেগুলো ধুয়েই রোদে দেওয়া যায়। তবে যেসব মাছ লম্বা যেমন, ছুরি মাছ আর লইট্যা মাছ, এগুলো একটি আরেকটির সঙ্গে ছররা বাঁধতে সময় বেশি লাগে। মানুষও লাগে বেশি।
আছাদগঞ্জের পাইকারি শুঁটকি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী বলেন, প্রতি মৌসুমে চট্টগ্রামের এসব আড়তে মাছের গুঁড়াসহ ১৫ থেকে ২০ হাজার মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদন হয়। যার বাজার মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা। উৎপাদিত এসব শুঁটকি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও পাঠানো হয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ আমেরিকায় বসবাসকারি বাঙালিদের কাছে চট্টগ্রামের শুঁটকির চাহিদা বেশি।
আছাদগঞ্জ শুঁটকি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. নাছির উদ্দিন জানান, দেশে শুঁটকির চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন বাড়ছে না। ফলে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে শুঁটকি আমদানি হচ্ছে। চিংড়ি, আইড়, পোয়া, গুলশা, বাইন, নলা, পাত্রা, ফাইস্যাসহ প্রায় সব ধরনের শুঁটকি আমদানি হয়। আমদানিকৃত শুঁটকি কোল্ডস্টোরে রাখতে হয়। এতে পোকার আক্রমণ কম হয়।
সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর, চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক মোঃ ফারুক হোসাইন সাগর বলেন, বঙ্গোপসাগর থেকে আহরণ করা বিশেষ জাতের ছোট আকৃতির মাছগুলো দিয়ে শুটকি উৎপাদন করা হয়। শুধু চট্টগ্রামে নয়, এখানে উৎপাদিত শুঁটকি ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর, নাটোরসহ সারাদেশের মানুষের চাহিদা মেঠানো হচ্ছে। এমনকি এখানে উৎপাদিত শুঁটকির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। দেশের মানুষের প্রোটিনের চাহিদার একটি বড় অংশ চট্টগ্রামে উৎপাদিত শুঁটকি থেকে পূরণ হচ্ছে বলে জানান তিনি।
শুঁটকি তৈরিতে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক কীটনাশক ব্যবহারের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এ প্রবণতা দিন দিন কমে আসছে। নিরাপদ শুঁটকি উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করতে আমরা নিয়মিত সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছি।’
কয়েকটি এনজিও সংস্থার সহযোগিতায় আমরা ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী এবং উৎপাদনকারীদের নিয়ে নিয়মিত উদ্বুদ্ধকরণ সভা করে যাচ্ছি। ফলে কীটনাশকের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে কমে আসছে বলে তিনি দাবী করেন।
সারিবদ্ধভাবে শুটকি শুকাতে দেখা যায় শহরের কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে। কর্ণফুলী ছাড়াও চট্টগ্রামের অন্যান্য এলাকায় বঙ্গোপসাগর থেকে মাছ সংগ্রহ করে শুটকি বানানো হয়ে থাকে। কর্ণফুলী নদীর উত্তর–দক্ষিণ তীরঘেঁষা বাকলিয়া, ইছানগর, ডাঙ্গারচর, কর্ণফুলী ঘাট ও জুলধায় গড়ে উঠেছে এ খাতের বিভিন্ন পল্লীগুলো। বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়া, কক্সবাজার ও টেকনাফ এলাকার গভীর সমুদ্র থেকে জেলেদের সংগ্রহ করা মাছ কর্ণফুলীর তীরে আনা হয়। শ্রমিকের সহজলভ্যতা এবং নৌপথ যোগাযোগের সুবিধার ভূমিকা রয়েছে এতে। এছাড়া কক্সবাজার, মহেশখালী, মাইশদিয়া, কুতুবদিয়া, কর্ণফুলী, চরচাক্তাই, রাঙাবালি অঞ্চলে শুটকি উৎপাদনের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত হয়ে থাকে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৭.৩ মিলিয়ন লোক প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। খাদ্য থেকে প্রাপ্ত প্রাণীজ আমিষের প্রায় ৬০% আসে মৎস্য ও মৎস্যজাত খাদ্য থেকে। দেশের মানুষের বার্ষিক জনপ্রতি মাছের চাহিদা ২০.৪৪ কেজি। চাহিদার বিপরীতে বার্ষিক জনপ্রতি খাদ্য হিসাবে মাছ গ্রহণ ১৮.৯৪ কেজি অর্থাৎ ১.৫০ কেজি ঘাটতি থাকে। এই গ্রহণকৃত মাছের প্রায় ৫% আসে শুটকি থেকে। বছরে প্রায় ৫.৪৬ লক্ষ মেট্রিক টন মৎস্য আহরিত হয় সমুদ্র থেকে যার ২০% শুটকি হিসাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয়।
বাংলাদেশে ৮–১০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ থেকে বাণিজ্যিকভাবে শুটকি তৈরি হয়। ১ কেজি শুটকি মাছ তৈরিতে প্রজাতি ভেদে প্রায় ৩–৫ কেজি কাঁচা মাছ প্রয়োজন। উপকূলীয় জেলে সমপ্রদায়ের লোকজন সমুদ্র থেকে মাছ সংগ্রহ করে। বাংলাদেশে মূলত শীতকালে শুটকির প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয়। সাধারনত অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে শুটকি শুকানো হয়। উৎপাদিত শুটকি ১৫টি বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে মূ্ল্য সংযোজিত হয়ে ৩–৬ ধাপ অতিক্রম করে ভোক্তার কাছে পৌঁছে। বাংলাদেশের উৎপাদিত সামুদ্রিক শুটকির সবচেয়ে বড় অংশই তৈরী হয় কক্সবাজারে।
উৎপাদিত শুটকির প্রায় ৮০% তৈরী হয় সদর উপজেলার কুতুবদিয়া পাড়া এলাকার নাজিরারটেকে। নাজিরারটেকের শুটকি উৎপাদনকারী উদ্যোক্ত, শ্রমিক ও বিপণন কাজে জড়িত লোকের সংখ্যা প্রায় ৮,৫০০–৯,০০০ জন। প্রচলিত নিয়মে সুর্যালোক ব্যবহার করে শুটকি শুকানো হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের জন্য শুটকির প্রক্রিয়াজাতকরণ কালে বিভিন্ন প্রকার ক্ষতিকর কেমিক্যাল বা কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। আর জেনে বা না জেনে এই শুটকি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করলে তা মানুষের শরীরে খুবই ক্ষতিকর রোগের সৃষ্টি করতে পারে।
চট্টগ্রামের চরচাক্তাই বাজার হচ্ছে শুটকির প্রধান আড়ৎ। এখানে বিশাল একটি শুটকিপল্লীও রয়েছে। মূলত অক্টোবর মাসের শুরু থেকে এখানে শুটকি উৎপাদন শুরু হয়ে যায় এবং নভেম্বরে শীতের শুরু থেকে পুরোদমে শুটকি উৎপাদনে নেমে যায় জেলে সমপ্রদায়। এখানে নানান ধরণের শুটকি মাছ সহজপ্রাপ্য এবং এখানকার শুটকি বিদেশের মাটিতেও বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। এখানকার শুটকি মাছ আমেরিকা, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, দুবাইসহ আরও কয়েকটি দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। মানভেদে এই শুটকিকে তিনটি গ্রেডে ভাগ করা হয়; এ, বি এবং সি। বিদেশে ‘এ’ গ্রেডের শুটকির চাহিদা বেশি। এছাড়া দেশের বিভিন্ন শহরের শুটকি ব্যবসায়ীরা এখান থেকে মানসম্মত শুটকি সংগ্রহ করতে আসেন এবং তা খুচরা বাজারে বিক্রি করে থাকেন।
চাক্তাইয়ের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইকবাল জানান, বর্তমানে কোরাল, লাদ্যা, চাপা, কামিলা, হাঙর, রূপচাঁদা, পোপা, রাঙাচকি, মাইট্যা, কালো উদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির শুটকি মাছ তিনি বিক্রি করছেন।
জানা যায়, এসব মাছ ১৫–২০ দিন সময় নিয়ে শুকাতে হয়। এসব শুটকি বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করার পর বিদেশে ব্যাপক চাহিদা মেটাতে রপ্তানিও করা হয়। আরো জানা যায় যে, শীতের দিনে চরম রোদের মাঝে শুটকি বেশী শুকানো হয় এবং বিকিকিনি ভালো হয়। অন্যান্য ঋতু বিশেষত বর্ষার সময় তেমন কেনাবেচা থাকে না কারণ তখন মাছের সংকট থাকে।এছাড়া বিভিন্ন দুর্যোগের ফলে বৃষ্টি ও সতর্ক সংকেত থাকলে মাছ শিকার বাধাগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি রোদের অপ্রতুলতা তো রয়েছেই।
চাক্তাই বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি কেজি রূপচাঁদা ১২০০ থেকে ২৫০০ টাকা, সুরমা ৮০০ থেকে ১৫০০, কোরাল এক হাজার থেকে ১৮০০, পোপা ৪০০ থেকে ১২০০, চিংড়ি এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০, লইট্যা ৪৫০ থেকে ১০০, ছুরি ৭০০ থেকে ১৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কক্সবাজার, বাঁশখালী, সন্দ্বীপ, আনোয়ারা, মহেশখালী ও পেকুয়ার উপকূলজুড়ে উৎপাদিত বিভিন্ন প্রজাতির শুটকি এখন শুধু দেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়, পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের নানা দেশে। স্বাদ, গুণগত মান ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণের সুবিধার কারণে বিদেশেও বাড়ছে চট্টগ্রামের শুটকির চাহিদা।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে চট্টগ্রামের লইট্টা, ছুরি, চিংড়ি, রূপচাঁদা, কোরাল ও ইচা শুটকি বেশ জনপ্রিয়। আধুনিক প্রক্রিয়ায় শুকানো ও স্বাস্থ্যসম্মত প্যাকেজিংয়ের কারণে এসব শুটকি এখন মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছেও সমাদৃত।
এ শিল্পকে ঘিরে হাজারো পরিবারের জীবিকা নির্ভরশীল। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক ব্যবসাও বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে।
চট্টগ্রামের উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শুটকির ঘ্রাণ যেন শুধু খাবারের স্বাদ নয়, বহন করছে এ অঞ্চলের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্পও।
ফরিদা|চখ
