চাক্তাইয়ের মোমবাতি শিল্প,অন্ধকারের আলো
দেশজুড়ে বাড়তে থাকা লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে মোমবাতির বাজারে। আলো জ্বালানোর জরুরি উপকরণ হিসেবে আবারও বেড়েছে মোমবাতির চাহিদা। এই সুযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন চট্টগ্রামের চাক্তাই এলাকার মোমবাতি ব্যবসায়ী ও কারখানার শ্রমিকরা।
গ্রীষ্মের শুরুতেই চট্টগ্রাম শহর ও গ্রামে বিদ্যুতের লোডশেডিং চলছে। শহরের তুলনায় গ্রামে লোডশেডিংয়ে মাত্রা বেশি। নগরে প্রতিদিন দুই থেকে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না আর গ্রামে তা সাত থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত গড়াচ্ছে। দিনের তুলনায় সন্ধ্যায় এবং রাতে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে।
এই শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাইকারি বাজার চাক্তাই। দীর্ঘদিন ধরে চাক্তাই এলাকায় অন্যান্য শিল্পের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য মোমবাতি তৈরির কারখানা ও পাইকারি বিপণন কেন্দ্র। এখান থেকে উৎপাদিত মোমবাতি শুধু চট্টগ্রামেই নয়, বরং ঢাকা, সিলেট, ফেনি, নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হচ্ছে।
চাক্তাই এলাকায় প্রায় ১০ থেকে ১৫টি মোমবাতি তৈরির কারখানা রয়েছে। প্রতিদিন এসব কারখানায় হাজার হাজার মোমবাতি উৎপাদিত হচ্ছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাইকারি দরে পাঠানো হচ্ছে। এখানে ছোট, মাঝারি ও বড়—সব ধরনের মোমবাতি পাওয়া যায়। সাধারণ সাদা মোমবাতির পাশাপাশি এখন বিভিন্ন রঙিন ও ডিজাইন করা ডেকোরেটিভ মোমবাতিও তৈরি হচ্ছে। কম দামে মানসম্মত পণ্য পাওয়ার কারণে ব্যবসায়ীদের কাছে চাক্তাইয়ের মোমবাতির আলাদা চাহিদা রয়েছে।
যেভাবে তৈরি হয় মোমবাতি:
মোমবাতি তৈরির প্রধান কাঁচামাল হলো প্যারাফিন ওয়াক্স, যা স্থানীয়ভাবে “সাদামোম” নামে পরিচিত। এছাড়া সুতা বা উইকও ব্যবহার করা হয়। প্যারাফিন ওয়াক্স গলিয়ে বিশেষ ডাইস বা ছাঁচের মাধ্যমে বিভিন্ন আকৃতির মোমবাতি তৈরি করা হয়। কারখানাগুলোতে মেশিন ও হাত—দুই পদ্ধতিতেই উৎপাদন করা হয়। প্রথমে গলিত মোম ছাঁচে ঢালা হয়, এরপর মাঝখানে সুতা স্থাপন করে নির্দিষ্ট সময় ঠাণ্ডা করা হয়। পরে তা ছাঁচ থেকে বের করে প্যাকেটজাত করা হয়। বর্তমানে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন রঙ, আকার ও নকশার মোমবাতিও তৈরি হচ্ছে।
মোমবাতি তৈরির কাঁচামাল:
মোমবাতি তৈরির বেশিরভাগ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বিশেষ করে রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও চীন থেকে প্যারাফিন ওয়াক্স আমদানি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম ওঠানামা করায় স্থানীয় বাজারেও এর প্রভাব পড়ে।ব্যবসায়ীরা জানান, আমদানি খরচ বৃদ্ধি, ডলার সংকট ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় বেড়েছে। তবুও চাহিদা থাকায় ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।
লোডশেডিং ছাড়াও বাড়ছে ব্যবহার:
একসময় মোমবাতির ব্যবহার সীমিত ছিল বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সময় পর্যন্ত। কিন্তু বর্তমানে এর ব্যবহার বহুমুখী হয়েছে। ধর্মীয় উপাসনালয়, মন্দির, গির্জা ও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মোমবাতির ব্যবহার নিয়মিত দেখা যায়। এছাড়া জন্মদিন, বিবাহ অনুষ্ঠান, রেস্টুরেন্ট ডেকোরেশন এবং বিভিন্ন উৎসবেও মোমবাতির ব্যবহার বেড়েছে। বিশেষ করে সুগন্ধি ও ডেকোরেটিভ মোমবাতির বাজার সম্প্রসারিত হওয়ায় নতুন উদ্যোক্তারাও এই খাতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
চাক্তাইয়ের ব্যবসায়ীরা বলছেন, মৌসুম ও চাহিদা অনুযায়ী প্রতি মাসে লাখ টাকার মোমবাতি বিক্রি হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এসে এখান থেকে পণ্য সংগ্রহ করেন।
মমতা ক্যান্ডেল ওয়ার্কাসের পরিচালক মোহাম্মদ জহির বলেন, “চাক্তাই থেকে আমাদের এই মোমবাতি ঢাকা, সিলেট, ফেনি, নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায়। মাঝেমধ্যে আমাদের বড় অর্ডার আসে। কোনো মাসে ৫ লাখ টাকা, কোনো মাসে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত মোমবাতি বিক্রি হয়।”
তিনি আরও জানান, বিদ্যুৎ সংকটের সময় চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানেও এখন মোমবাতির ব্যবহার বাড়ছে।
কর্মসংস্থানে ভূমিকা:
চাক্তাই য়ের মোমবাতি শিল্প স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কারখানাগুলোতে নারী-পুরুষ উভয়েই কাজ করছেন। বিশেষ করে স্বল্প পুঁজিতে ছোট আকারে এই ব্যবসা শুরু করা সম্ভব হওয়ায় অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এ খাতে যুক্ত হচ্ছেন।ব্যবসায়ীদের মতে, সরকারি সহায়তা, সহজ ঋণ সুবিধা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে দেশের মোমবাতি শিল্প আরও বড় পরিসরে বিকশিত হতে পারে।
মমতা ক্যান্ডেল ওয়ার্কাসে কর্মরত আব্দুল আলম বলেন, ‘এই কারখানায় আমি দীর্ঘ ৭ বছর ধরে কাজ করছি। এখানে কাজ করেই আমি সংসার চালাচ্ছি, আমার পাশাপাশি এখানে প্রায় ১০ জন লোক কাজ করে।’
অপর শ্রমিক মালেক বলেন, ‘মোমটা গ্যাসের বড় চুলায় গলিয়ে তারপর সাচে ফেলে শুখালেই মোমবাতি তৈরি হয়ে যায়। এর আগে থেকে সাচে পরিমান মতো সুতা দেওয়া থাকে। বড় মোমবাতিতে লম্বা এবং মোটা সুতা ব্যবহার করা হয়।
সামগ্রিকভাবে, চট্টগ্রামের চাক্তাই কেন্দ্রিক মোমবাতি শিল্প শুধু একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা নয়, বরং এটি সম্ভাবনাময় একটি শিল্পখাত হিসেবে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে রপ্তানির সুযোগও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চাহিদা বৃদ্ধি, নতুন ডিজাইনের পণ্য উৎপাদন এবং উদ্যোক্তাদের আগ্রহ—সব মিলিয়ে চাক্তাইয়ের মোমবাতি শিল্প এখন সম্ভাবনার নতুন আলো জ্বালাচ্ছে।
চখ/ককন
