চট্টগ্রামে মাদকে বাড়াচ্ছে কিশোর গ্যাং
চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের উপজেলাগুলোতে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। পাড়া-মহল্লার অলিগলি থেকে শুরু করে রাজপথ—সবখানেই এখন এই কিশোর অপরাধীদের পদচারণা। আর এই গ্যাং কালচারের নেপথ্যে অন্যতম ইন্ধন হিসেবে কাজ করছে সর্বনাশা মাদক। একসময় এলাকাভিত্তিক ছোটখাটো গ্রুপে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে এসব গ্যাং মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারামারি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তারে জড়িয়ে পড়ছে। এতে সাধারণ মানুষ, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাড়ছে উদ্বেগ।
পুলিশের তথ্য ও মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আধিপত্য বিস্তার আর মাদকের টাকা জোগাড় করতেই এই কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে খুন, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসার মতো ভয়ংকর অপরাধে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সন্ধ্যার পর অলিগলি, পার্ক, স্কুলের আশপাশ ও খালি মাঠে কিশোরদের সংঘবদ্ধ আড্ডা এখন নিয়মিত দৃশ্য। অনেকেই প্রকাশ্যে মাদক সেবন করছে। সামান্য বিরোধ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যকে কেন্দ্র করেও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে তারা।
বিশেষ করে নগরীর কোতোয়ালী, আকবরশাহ, বায়েজিদ, ডবলমুরিং, পাহাড়তলী, চান্দগাঁও, বাকলিয়া, হালিশহর ও কর্ণফুলী এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। সন্ধ্যার পর নির্জন এলাকা তো বটেই, এমনকি জনাকীর্ণ এলাকাতেও পথচারীদের মোবাইল বা ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে দ্বিধা করছে না তারা। প্রতিবাদ করলে মুহূর্তেই চাকু বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালাচ্ছে। উপজেলাগুলোর মধ্যে আনোয়ারা, পটিয়া ও বাঁশখালীতেও সম্প্রতি কিশোর অপরাধের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বেশিরভাগ কিশোর গ্যাং সদস্য স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিংবা ঝরে পড়া শিক্ষার্থী। তাদের অনেকেই মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। ইয়াবা, গাঁজা ও নেশাজাতীয় ট্যাবলেট সহজলভ্য হওয়ায় কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
নগরীর এক অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আগে ছেলেমেয়েদের নিয়ে এত ভয় ছিল না। এখন সন্ধ্যার পর বাইরে থাকলে আতঙ্ক লাগে। ছোট বয়সেই তারা ভয়ংকর হয়ে উঠছে।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরের ১৬টি থানা এলাকায় বর্তমানে অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এই গ্যাংগুলোর সদস্যদের বড় অংশই মাদকাসক্ত। বিশেষ করে ‘ওয়াই’ বা ইয়াবার পাশাপাশি নতুন ধরনের সিন্থেটিক মাদকের বিস্তার এদের মধ্যে বেশি। স্থানীয় ডিলাররা এই কিশোরদের ব্যবহার করে নিরাপদ ‘কুরিয়ার’ হিসেবে। বিনিময়ে তাদের দেওয়া হয় ফ্রি মাদক অথবা সামান্য টাকা, যা দিয়ে তারা আবারও মাদক কেনে। এভাবেই মাদকের চক্রে আটকা পড়ে তারা নামছে ছিনতাই বা চাঁদাবাজিতে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা কিছু তথাকথিত ‘বড় ভাই’ নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য এই কিশোরদের ব্যবহার করেন। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে লোক সমাগম করা এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার হাতিয়ার হিসেবে এই কিশোররা ব্যবহৃত হচ্ছে। বিনিময়ে এই বড় ভাইয়েরা কিশোরদের অপরাধ আড়াল করতে থানা-পুলিশ বা স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব খাটান, যা তাদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
এক সময় ধারণা করা হতো কিশোর গ্যাং কেবল বস্তি বা নিম্ন আয়ের মানুষের এলাকায় সীমাবদ্ধ, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে নগরের অভিজাত এলাকাগুলোতেও ‘বাইক গ্যাং’ বা ‘স্মার্ট গ্যাং’ নামে ছোট ছোট গ্রুপ গড়ে উঠেছে। এরা মূলত দ্রুতগতির মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া দেয় এবং পথচারীদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ ছুটির সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে এদের আনাগোনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে মাদক সিন্ডিকেটগুলো এখন কিশোরদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। বয়সে ছোট হওয়ায় পুলিশের তল্লাশিতে এরা অনেক সময় ছাড় পেয়ে যায়, আর এই সুযোগটিই নিচ্ছে বড় বড় মাদক ব্যবসায়ীরা। অল্প বয়সেই হাতে কাঁচা টাকা আসায় এই কিশোররা পড়াশোনা ছেড়ে পাকাপোক্ত অপরাধী হয়ে উঠছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সমাজবিজ্ঞানী বলেন, “পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতা, সুস্থ বিনোদনের অভাব এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় গ্যাং কালচারের প্রচার কিশোরদের বিপথে নিচ্ছে। মাদক যখন এর সাথে যুক্ত হয়, তখন একজন কিশোরের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়। এটি কেবল একটি আইনি সমস্যা নয়, একটি গভীর সামাজিক ব্যাধি। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, কাউন্সেলিং এবং পারিবারিক বন্ধন জোরদারের মাধ্যমে কিশোরদের ইতিবাচক পথে ফিরিয়ে আনতে হবে।”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক নজরদারির অভাব, অনলাইন আসক্তি এবং মাদকের সহজপ্রাপ্যতা কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। অনেক কিশোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের ‘গ্রুপ’ পরিচয় দিতে গিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়া অধিকাংশ সদস্যই পারিবারিক শৃঙ্খলার বাইরে। অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের অবহেলা বা সন্তান কোথায় কার সাথে সময় কাটাচ্ছে সে বিষয়ে তদারকি না থাকায় তারা বিপথে পা বাড়াচ্ছে। এলাকাভিত্তিক পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকা এবং সুস্থ বিনোদনের অভাবকেও এই অপরাধ বিস্তারের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, “কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অভিভাবকদেরও আরও সচেতন হতে হবে।”
চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করে, কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ জোরদার করার পাশাপাশি কিশোরদের সুস্থ ধারার রাজনীতি ও খেলাধুলায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। একই সাথে মাদকের সরবরাহ পথ বন্ধে কঠোর হতে হবে প্রশাসনকে। তাদের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
ফরিদা|চখ
