chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

টেকনাফে বিদ্যুৎ সংকট চরমে, অন্ধকারে বাড়ছে অপরাধ

কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক শহরে রূপ নিতে পারেনি। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট এ জনপদের প্রায় ৪ লাখ মানুষের জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। ঘনঘন লোডশেডিং ও দীর্ঘ সময়ের ব্ল্যাকআউটের কারণে রাত নামলেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। সেই অন্ধকারকে পুঁজি করে বেড়ে যাচ্ছে ছিনতাই, অপহরণ, মাদক ও মানবপাচারসহ নানা অপরাধ। পৌর শহর এলাকা, সদর ইউনিয়ন, সাবরাং, হ্নীলা ও বাহারছড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ জনপদগুলো গভীর রাতে কার্যত অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে। এই পরিস্থিতি অপরাধীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, কক্সবাজার জেলায় বর্তমানে প্রায় ১২৮৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে উৎপাদিত হয় প্রায় ১২০০ মেগাওয়াট। এছাড়া খুরুশকুল ও চৌফলদন্ডীর বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং টেকনাফের আলীখালীর সোলার প্রকল্প থেকে মিলিয়ে আরও ৮৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কক্সবাজারের মানুষ মূলত এই ৮৬ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ওপরই নির্ভরশীল। কারণ, মাতারবাড়ির ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে চলে যায়।

জানা গেছে, মাতারবাড়ি গ্রিডের সাবস্টেশন ৪০০ কেভি ক্ষমতাসম্পন্ন হলেও কক্সবাজারের সাবস্টেশন এখনো ১৩২/৩৩ কেভি ক্ষমতার। ফলে মাতারবাড়িতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি কক্সবাজার অঞ্চলে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজারবাসীকে সেই বিদ্যুতের সুবিধা দিতে হলে স্থানীয় সাবস্টেশনকে ৪০০ কেভিতে উন্নীত করতে হবে অথবা মাতারবাড়ি সাবস্টেশন থেকেই বিদ্যুৎ কনভার্ট করে ১৩২/৩৩ কেভি লাইনে সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, কক্সবাজারে বিদ্যুতের চাহিদা শুধু আবাসিক ব্যবহারের জন্য নয়। জেলার পর্যটনশিল্প, লবণ শিল্প, চিংড়ি খাত এবং উদীয়মান শিল্প-কারখানার জন্যও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অত্যন্ত জরুরি। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত উন্নয়নে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

কারণ, বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিও স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠক হেলাল উদ্দীন বলেন, টেকনাফে দীর্ঘদিন ধরে চলমান লোডশেডিং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একজন সচেতন গ্রাহক হিসেবে আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। আলীখালী সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ টেকনাফে যুক্ত করা গেলে হয়তো লোডশেডিং অনেকটা কমে আসতো। বিশেষ করে নতুন সাবস্টেশন চালু হলে ভোল্টেজ সমস্যা ও লোডশেডিং কমে আসবে বলে ধারণা করা যায়।

তিনি আরও বলেন, গ্রাহকদের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত নানা জটিলতা। অনেক সময় অতিরিক্ত বিল, মিটার রিডিংয়ের অসঙ্গতি কিংবা বিল সংশোধনে ভোগান্তির অভিযোগ শোনা যায়। আমরা চাই বিদ্যুৎ বিভাগের সেবার মান আরও স্বচ্ছ ও গ্রাহকবান্ধব হোক। নিয়মিত মনিটরিং, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে জনগণের আস্থা আরও বাড়বে।

স্থানীয় সাংবাদিক নুরুল করিম রাসেল অভিযোগ করে জানান, ন্যাশনাল গ্রিডের রক্ষণাবেক্ষণের কথা বলে সারাদিন বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হয়। আবার সন্ধ্যায় লাইন চালু হওয়ার কিছুক্ষণ পরই তা বন্ধ হয়ে যায়। কখনো আন্ডার ভোল্টেজ, কখনো ওভারলোড, ৩৬৫ দিনই কোনো না কোনো অজুহাত থাকে। কখনো তার ছিঁড়ে যায়, কখনো খুঁটি ভেঙে পড়ে। সারাবছর জোড়াতালি দিয়ে চলছে টেকনাফ পল্লী বিদ্যুৎ ব্যবস্থা।

স্থানীয় গ্রাহক মাওলানা রুবায়েত হোসাইন বলেন, টেকনাফের প্রায় ৪ লাখ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে। প্রতিদিন ঘনঘন লোডশেডিং, কম ভোল্টেজ, দুর্বল ৩৩ কেভি লাইন ও দীর্ঘ সময়ের ব্ল্যাকআউট মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে। অথচ টেকনাফেই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে, কিন্তু স্থানীয় মানুষ সেই বিদ্যুতের সুবিধা পাচ্ছে না; বরং প্রায় ২৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে চলে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, দুর্বল ৩৩ কেভি লাইন অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে না পেরে বারবার ট্রিপ করছে, ফলে লো-ভোল্টেজ সৃষ্টি হচ্ছে। পুরোনো ফিডার ও ট্রান্সফরমার, পর্যাপ্ত সাবস্টেশনের অভাব এবং দ্রুত বাড়তে থাকা চাহিদা সামাল দিতে না পারায় সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, অনলাইন ক্লাস বন্ধ থাকছে, গরমে মানুষ রাত জেগে কষ্ট পাচ্ছে। হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা, অক্সিজেন ও বিভিন্ন চিকিৎসা যন্ত্রপাতি পরিচালনাও ব্যাহত হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, মাছ ও খাদ্য সংরক্ষণ, ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সবখানেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, টেকনাফে গ্রিড চালুর প্রক্রিয়া থাকলেও তা এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। তারা জরুরি ভিত্তিতে নতুন ১৩২ কেভি লাইন ও সাবস্টেশন স্থাপন, আধুনিক বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণ, নতুন ফিডার ও ট্রান্সফরমার সংযোজন এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির টেকনাফ জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মো. আবুল বাশার আজাদ জানান, টেকনাফে বর্তমানে ৩৩ কেভি ক্ষমতাসম্পন্ন লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত দীর্ঘ দূরত্বের লাইনে পর্যাপ্ত লোড বহন করা সম্ভব হয় না। এ কারণে ঘনঘন লোডশেডিংয়ের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের সময় ২৬-২৭ মেগাওয়াটের বেশি লোড নেওয়া সম্ভব হয় না, ফলে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হয়।

লোডশেডিং থেকে স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, টেকনাফে একটি গ্রিড সাবস্টেশন স্থাপন করা গেলে বিদ্যুৎ সরবরাহের এ সংকট অনেকটাই দূর হবে। তখন টেকনাফের মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পাবে।

সচেতন মহলের মতে, টেকনাফের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। টেকনাফে গ্রিড স্থাপন, নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, রাতের অন্ধকারে নিরাপত্তা জোরদার করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি বৃদ্ধি, বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং অপরাধচক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে টেকনাফের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।

 

মআ/চখ

এই বিভাগের আরও খবর