chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

সীমান্তজুড়ে চোরাকারবারিদের দাপট, আতঙ্কে স্থানীয়রা

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত। সীমান্তের একের পর এক দুর্গম পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিনই বাংলাদেশে ঢুকছে বার্মিজ ইয়াবা, আইস ও গবাদিপশু। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে সার, ভোজ্যতেল, ঔষধ, ডিম, খাদ্যপণ্য, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, কসমেটিকস ও গাড়ির যন্ত্রাংশসহ শতাধিক ধরনের মালামাল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রামুর গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ এবং নাইক্ষ্যংছড়ির সদর ও দোছড়ি ইউনিয়নকেন্দ্রিক প্রায় পাঁচ শতাধিক চোরাকারবারির সংঘবদ্ধ চক্র সীমান্তজুড়ে এই অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে পাহাড়ি পথ, ছড়া ও গ্রামীণ সড়ক ব্যবহার করে চলছে চোরাচালানের মহোৎসব।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঈদ সামনে রেখে সীমান্তে গবাদিপশু ও মাদক পাচার কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে তুমব্রু, ফুলতলী, কোনারপাড়া, মংজয়পাড়া ও রেইক্ষ্যাশিয়া পোস্টসহ অন্তত আটটি পয়েন্ট এখন চোরাকারবারিদের জন্য ‘স্বর্গরাজ্য’ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (৭ মে) ভোর রাতে ঘুমধুম ইউনিয়নের মংজয়পাড়া সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে গবাদিপশুর চালান আনার চেষ্টা করে চোরাকারবারিরা। পরে কোটবাজার ও মরিচ্যা পশুর হাটে নেওয়ার পথে ৩৪ বিজিবির অধীনস্থ মংজয়পাড়া ক্যাম্পের সদস্যরা তিনটি গরু জব্দ করেন। বিজিবি সদস্যরা জানান, চলতি মৌসুমে ওই পয়েন্টে এটিই প্রথম বড় চালান। তবে সীমান্তজুড়ে আরও বড় সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে তাদের ধারণা।

গত মঙ্গলবার (৫ মে) রাতে ঘুমধুম সীমান্তের তুমব্রু এলাকার কোনারপাড়া পয়েন্ট দিয়ে বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশি পণ্য মিয়ানমারে পাচারের সময় বাধা দেয় বিজিবি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে চোরাকারবারিরা দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে বিজিবি সদস্যদের ওপর হামলা চালায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, হাতাহাতি ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। হামলার নেতৃত্ব দেয় কথিত সিন্ডিকেট প্রধান মিজান, আশরাফুল ও জহির। স্থানীয়দের ভাষ্য, অন্ধকারে বিজিবিকে আঘাত করতে গিয়ে নিজেদের লোককেই লাঠির আঘাতে আহত করে চোরাকারবারিরা। এতে আশরাফুল নামে একজন গুরুতর আহত হন।

এর আগে গত বছরের ৯ মার্চ ফুলতলী বিওপির রেইক্ষ্যাশিয়া পোস্ট এলাকায় প্রায় ৩০-৪০টি বার্মিজ গরু নিয়ে সীমান্ত অতিক্রমের সময় বিজিবির ওপর হামলা চালায় আরেকটি চক্র। ওই ঘটনায় ল্যান্স নায়েক রাজু ও সিপাহি শরিফ আহত হন। পরে মো. ইসমাইলসহ অজ্ঞাত ১০-২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

সীমান্তের কোনারপাড়া পয়েন্ট ঘুরে স্থানীয়রা জানান, তুমব্রু খালের অগভীর পানি পেরোলেই মিয়ানমার সীমান্ত। ওই এলাকায় বাংলাদেশের কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। মিয়ানমারের পুরোনো কাঁটাতারও বিভিন্ন স্থানে কেটে সরু পথ তৈরি করেছে বিদ্রোহীরা।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো নিজেরাই সীমান্তে চলাচলের গোপন পথ তৈরি করে দিয়েছে। ফলে চোরাকারবারিরা নির্বিঘ্নে যাতায়াত করছে। একই পথ ব্যবহার করে খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় দ্রব্য সংগ্রহ করছে বিদ্রোহীরাও।

একাধিক সীমান্তবাসী জানান, দিনের বেলায় সীমান্ত শান্ত মনে হলেও রাত হলেই শুরু হয় মালামাল বহনের প্রতিযোগিতা। পাহাড়ি পথ দিয়ে সারি সারি মানুষ পণ্য নিয়ে যাওয়া-আসা করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নাইক্ষ্যংছড়ি ও পার্শ্ববর্তী বাজারগুলো থেকে দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারে অবৈধভাবে ঔষধ পাচার হচ্ছে। একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট বিভিন্ন ফার্মেসি থেকে বিপুল পরিমাণ ঔষধ সংগ্রহ করে সীমান্তের গোপন রুট দিয়ে পাচার করছে। সম্প্রতি গর্জনিয়া বাজারের পূর্ব পাশে একটি ঔষধবাহী কোম্পানির গাড়ি থেকে পাচারের সময় তিনজনকে আটক করে আদালতে পাঠানো হলেও মূল হোতারা পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও সীমান্তের ভৌগোলিক দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে চোরাকারবারিরা। যদিও বিজিবি সীমান্তে কড়া অবস্থানে রয়েছে বলে দাবি করেছে।

কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের (৩৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম পিএসসি, পিবিজিএম বলেন, “সীমান্তে চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। যেখানেই চোরাচালানের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কোনো চোরাকারবারিকে ছাড় দেওয়া হবে না।”

এদিকে নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোজাম্মেল হক বলেন, চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে বিজিবি বাদী হয়ে একাধিক মামলা করেছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই সীমান্তে গবাদিপশু ও মাদক চোরাচালান ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। তাদের দাবি, দ্রুত কার্যকর অভিযান ও সীমান্ত নজরদারি জোরদার না হলে নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্ত অঞ্চল আবারও বড় ধরনের অপরাধচক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।

তাসু/চখ

এই বিভাগের আরও খবর