chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

গোলাগুলির শব্দে কেঁপে উঠল ঘুমধুম, ঘরছাড়া বহু পরিবার

দীর্ঘদিন নিস্তব্ধ থাকার পর আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্ত। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রায় দুই ঘণ্টা ব্যাপক গোলাগুলির পর কাঁটাতার ঘেঁষে নতুন করে অবস্থান নিয়েছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)। সীমান্তের শূন্যরেখার কাছাকাছি ফাঁকা আস্তানায় তাদের পতাকা উত্তোলনের পাশাপাশি সশস্ত্র নারী ও পুরুষ সদস্যদের উপস্থিতি চোখে পড়েছে।

এ ঘটনায় সীমান্তসংলগ্ন অন্তত দুই শতাধিক পরিবারের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিরাপত্তা শঙ্কায় কৃষক, মাছচাষি ও দিনমজুররা স্বাভাবিক কাজে যেতে সাহস পাচ্ছেন না।

স্থানীয় সূত্র ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোমবার (৪ মে) সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিট থেকে রাত প্রায় ৮টা পর্যন্ত মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জলপাইতলী ও ঢেকুবুনিয়া ফকিরপাড়া ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।

স্থানীয়দের দাবি, এ সময় প্রায় দুই শতাধিক রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়।

পরদিন মঙ্গলবার (৫ মে) সকাল থেকে সীমান্তঘেঁষা ওইসব এলাকায় আবারও সক্রিয়ভাবে অবস্থান নিতে দেখা যায় আরাকান আর্মির সদস্যদের। সংবাদের ক্যামেরায় ধরা পড়ে তাদের উপস্থিতির দৃশ্য—যেখানে কাঁটাতারের ওপারে ফাঁকা আস্তানায় উড়ছে তাদের পতাকা, আর টহল দিচ্ছে সশস্ত্র সদস্যরা।

ঘুমধুম ইউনিয়নের জলপাইতলী এলাকার বাসিন্দা মো. নুরুল আবছার জানান, মাগরিবের নামাজের পর হঠাৎ করে গুলির শব্দ শুরু হয়। দুই দিক থেকেই এলোপাতাড়ি গুলি চলছিল। অনেক দিন এমন কিছু শুনিনি। হঠাৎ করে আবার তাদের উপস্থিতিতে আমরা খুবই আতঙ্কিত।

জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি বসবাসকারী বৃদ্ধ মো. নুর হোসেন বলেন, গুলির শব্দ এতটাই ভয়ংকর ছিল যে ঘরে থাকা সম্ভব হয়নি। পরিবার নিয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নিই। সকালে আবার ফিরে আসি, কিন্তু এখনো ভয় কাটেনি।

অটোচালক সাহেদ জানান, যাত্রী নিয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ গুলি শুরু হলে গাড়ি থামিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা নিরাপদ জায়গায় লুকিয়ে থাকি। এমন পরিস্থিতিতে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

আরেক বাসিন্দা মো. নুরুল কবির বলেন, আমাদের বাড়ি সীমান্তের খুব কাছেই। মনে হচ্ছিল গুলি যেন বাড়ির ভেতরেই এসে পড়বে। এমন আতঙ্ক আগে দেখিনি।

স্থানীয় যুবক মো. শাহজাহান বলেন, কমপক্ষে ২০০ রাউন্ড গুলির শব্দ শুনেছি। তবে ঠিক কী কারণে সংঘর্ষ হয়েছে, সেটা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।

* নারী সদস্যসহ সশস্ত্র উপস্থিতিঃ

স্থানীয়দের দাবি, এবার শুধু পুরুষ নয়, নারী সদস্যদেরও অস্ত্র হাতে দেখা গেছে। জলপাইতলী ছাড়াও ঢেকুবুনিয়া ফকিরপাড়া ক্যাম্প এলাকায় তাদের সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এতে করে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সীমান্তবাসী।

এ বিষয়ে কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম পিএসসি, পিবিজিএম বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে, তা সম্পূর্ণ তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সেখানে আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী রয়েছে, যারা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়াতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ঘটনাটি বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার ভেতরে সংঘটিত হয়েছে। আমরা বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। সীমান্তে টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সীমান্তবাসীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিজিবি সর্বদা সতর্ক রয়েছে এবং সীমান্ত সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ঘুমধুম সীমান্তঘেঁষা এলাকায় প্রায় দুই শতাধিক পরিবারের বসবাস। তাদের বেশিরভাগই কৃষি, মাছচাষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সীমান্তে উত্তেজনা দেখা দিলেই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন এই সাধারণ মানুষগুলো। বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমান্তজুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। যদিও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সীমান্তে সরাসরি কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি, তবুও অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কে দিন কাটছে সীমান্তবাসীর।

তাসু/চখ

এই বিভাগের আরও খবর