ছুটির দিনে পলোগ্রাউন্ডে উৎসবের আমেজ
নগরীর পলোগ্রাউন্ড মাঠে পা রাখতেই চারদিকে রঙিন আলোকসজ্জা, মাইকে ভেসে আসা গান, মানুষের কোলাহল আর সারি সারি বাহারি স্টল চোখে পড়ে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার হওয়ায় গতকাল দুপুরের পর থেকেই বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। সন্ধ্যা নামতেই পুরো মেলাপ্রাঙ্গণ যেন পরিণত হয় উৎসবের নগরীতে।
গত ১১ এপ্রিল শুরু হয় চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির আয়োজনে আন্তর্জাতিক নারী এসএমই মেলা ২০২৬। প্রথম দিকে মেলা অনেকটা ঝিমিয়ে থাকলেও এখন বেশ জমে উঠেছে। মেলায় আগত ব্যবসায়ীরা বলছেন কালবৈশাখী ঝড়ের কারণে গত কয়েকদিন ব্যবসায় ধাক্কা লেগেছে। তবে শুক্রবার বৃষ্টি না হওয়ায় সকাল থেকেই দর্শনার্থীরা আসছেন। এভাবে চলছে আশা করিছে ভালোকিছু থাকবে মাস শেষে।
মেলা কতৃপক্ষ জানায়, মাসব্যাপী চলা এ মেলায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের নারী উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা অংশ নিয়েছেন। ফলে দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বৈচিত্র্যের এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে পুরো আয়োজনজুড়ে।
মেলায় প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। কেউ পরিবারের সঙ্গে ঘুরছেন, কেউ ব্যস্ত কেনাকাটায়, আবার কেউ খাবারের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে পছন্দের খাবার বেছে নিচ্ছেন। শিশুদের উচ্ছ্বাস, তরুণদের ছবি তোলা আর পরিবারগুলোর আনন্দঘন সময় কাটানো—সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশে ছিল প্রাণের ছোঁয়া।
তবে পুরো মেলার অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে আচার, পিঠার দোকানগুলো। বাহারি স্বাদের পিঠা আর আচারের কারণে সারাক্ষণই এ দোকানগুলোতে ছিল দর্শনার্থীদের ভিড়। ভাপা পিঠা, পাটিসাপটা, দুধচিটই থেকে শুরু করে নানা স্বাদের ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরি হচ্ছিল চোখের সামনেই। কেউ বসে খাচ্ছেন, কেউ আবার পরিবারের জন্য প্যাকেট করে নিয়ে যাচ্ছেন। স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকেই বলছিলেন, শহুরে ব্যস্ত জীবনে এমন দেশীয় স্বাদের আয়োজন যেন অন্যরকম ভালো লাগা তৈরি করেছে।
মেলার এক প্রান্তজুড়ে রয়েছে দেশীয় পোশাকের বাহারি আয়োজন। জামদানি, তাঁত, রেশমি শাড়ি, থ্রি-পিস, হাতে তৈরি গহনা ও ফ্যাশন সামগ্রীর স্টলগুলোতে নারীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। অন্যদিকে বাঁশ-বেতের তৈরি চেয়ার, শোপিস, ফুলের টব, মাটির থালা-বাটি ও ঘর সাজানোর নানা সামগ্রীও আকর্ষণ করেছে দর্শনার্থীদের।
বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তান থেকে আসা উদ্যোক্তাদের স্টলগুলোতে ছিল বাড়তি আগ্রহ। বিদেশি পোশাক, অলঙ্কার, কসমেটিক্স, জুতা ও হস্তশিল্প পণ্যের কারণে এসব স্টলে দিনভর ভিড় লেগেই ছিল। অনেক দর্শনার্থী বলছেন, এক জায়গায় বিভিন্ন দেশের পণ্য দেখার সুযোগ মেলায় আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
ফরিদপুর থেকে আসা মৃৎশিল্প ব্যবসায়ী আনিসুর জামান বলেন, “আমরা সারা বছর বিভিন্ন মেলায় ঘুরে ব্যবসা করি। কয়েক বছর ব্যবসা খুব খারাপ গেছে। এবার মেলায় মানুষের উপস্থিতি দেখে নতুন করে আশা জেগেছে।”
মেলায় ঘুরতে আসা বহদ্দারহাটের বাসিন্দা এসকান্দার মাহবুব বলেন, “পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য দারুণ একটি আয়োজন এটি। কেনাকাটার পাশাপাশি একটা উৎসবের অনুভূতিও পাওয়া যাচ্ছে।” তার স্ত্রী শিরিন বেগম জানান, মেলা থেকে তিনি মাটির তৈজসপত্র ও একটি তাঁতের শাড়ি কিনেছেন।
তবে কিছু দর্শনার্থী পণ্যের দাম নিয়ে আক্ষেপও জানিয়েছেন। পিংকি আক্তার নামে এক দর্শনার্থী বলেন, “মেলায় অনেক সুন্দর জিনিস পাওয়া যাচ্ছে, তবে কিছু পণ্যের দাম একটু বেশি মনে হয়েছে।”
আয়োজকদের মতে, নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য প্রদর্শন, ব্যবসার প্রসার এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরির লক্ষ্যেই এ মেলার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে দর্শনার্থীর সংখ্যা। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে মানুষের উপস্থিতি কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে পলোগ্রাউন্ডের আন্তর্জাতিক নারী এসএমই মেলা এখন শুধু কেনাবেচার আয়োজন নয় এটি হয়ে উঠেছে সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, নারী উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনা এবং নগর জীবনের আনন্দঘন মিলনমেলার এক বর্ণিল প্রতিচ্ছবি।
