chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

রূপপুরে জ্বালানি প্রবেশ আজ

পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুগে বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র’–এর প্রথম ইউনিটে আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশ বাস্তবিক অর্থে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে প্রবেশ করল।

 

পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত এ প্রকল্পে ইউরেনিয়ামভিত্তিক জ্বালানি চুল্লিতে স্থাপন করা হলে তাপ উৎপন্ন হবে। সেই তাপ থেকে বাষ্প তৈরি হয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

 

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি প্রবেশের কাজ শেষ করতে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগবে। এরপর পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে আরও ৩৪ দিন প্রয়োজন হবে।

 

পরবর্তী পর্যায়ে ধাপে ধাপে রিএক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো হবে—৩%, ৫%, ১০%, ২০% হয়ে ৩০% পর্যন্ত। এই ধাপ শেষ হতে আরও প্রায় ৪০ দিন লাগতে পারে। তখনই প্রথমবারের মতো জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে।

 

পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। তবে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস।

 

জ্বালানি প্রবেশ কার্যক্রম উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক। এছাড়া আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হবেন।

রূপপুর প্রকল্পে মোট দুটি ইউনিট নির্মাণ করা হচ্ছে, প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, আর নির্মাণকাজে রয়েছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট।

 

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, পুরো প্রকল্প চালু হলে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০–১২ শতাংশ এখান থেকে পূরণ করা সম্ভব হবে।

 

পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানি মূলত ইউরেনিয়াম থেকে তৈরি। ছোট ছোট জ্বালানি দানা (প্যালেট) ধাতব নলের মধ্যে সাজিয়ে তৈরি হয় রড, আর একাধিক রড মিলে গঠিত হয় ফুয়েল এসেম্বলি বা বান্ডিল।

 

রূপপুরের প্রথম ইউনিটে একসঙ্গে ১৬৩টি জ্বালানি বান্ডিল ব্যবহার করা হবে। প্রতিটি বান্ডিলে রয়েছে শতাধিক জ্বালানি রড। একবার জ্বালানি স্থাপন করলে প্রায় ১৮ মাস পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

 

ব্যবহৃত জ্বালানি তেজস্ক্রিয় হওয়ায় তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান বজায় রেখে পুনরায় রাশিয়ায় পাঠানো হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক তদারকির আওতায় থাকবে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় সাশ্রয়ী। একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা বা তেলের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে।

 

সরকারি হিসাবে, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে বছরে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি প্রায় আড়াই হাজার মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং নির্মাণকাজে প্রতিদিন হাজারো শ্রমিক কাজ করেছেন।

 

মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পের প্রথম ইউনিট চালুর কথা ছিল ২০২৩ সালে। তবে করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সরঞ্জাম সরবরাহ জটিলতা ও ডলার সংকটসহ নানা কারণে প্রকল্পটি পিছিয়ে যায়।

 

বর্তমানে সংশোধিত সময়সূচি অনুযায়ী, প্রথম ইউনিট ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৭ সালের শেষে চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরো প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বেড়েছে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিরাপত্তা সর্বোচ্চ গুরুত্বের বিষয়। দক্ষ জনবল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখ এসব ক্ষেত্রেই সতর্ক থাকতে হবে।

 

তাদের মতে, জ্বালানি প্রবেশ একটি বড় মাইলফলক হলেও প্রকৃত সাফল্য আসবে যখন নিয়মিতভাবে নিরাপদ বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে।

 

আজকের জ্বালানি প্রবেশ কার্যক্রম বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এক ঐতিহাসিক সূচনা। ধাপে ধাপে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শেষে পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাতে সময় লাগলেও, এটি দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা ও জ্বালানি বৈচিত্র্যে বড় পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মুন্নি/চখ

এই বিভাগের আরও খবর