বলি খেলার আগে জমে উঠেছে বৈশাখী মেলা, ঐতিহ্য আর সৌখিনতার মেলবন্ধনে মুখর চট্টগ্রাম
লালদিঘিতে রঙিন অপেক্ষা
চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র লালদিঘি যেন আবারও ফিরে পেল তার চিরচেনা উৎসবের রূপ। শতবর্ষের ঐতিহ্য বুকে ধারণ করা জব্বরের বলিখেলা আর বৈশাখী মেলা ২০২৬ ঘিরে নগরজুড়ে বইছে উৎসবের আমেজ। শুধু বলিখেলার উত্তেজনাই নয়, মেলার রঙিন আয়োজনও টানছে নানা বয়সী মানুষের ঢল।
হঠাৎ চোখে পড়লেই থমকে দাঁড়াতে হয় রাস্তার ধারে সারি সারি সাজানো বাঁশ-বেতের ঝাড়, কুলা, চালুন আর নানা আকারের ঝুড়ি। আন্দরকিল্লা থেকে লালদিঘি পর্যন্ত বিস্তৃত এই মেলায় দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসের বিশাল সমাহার। প্রথম দিন থেকেই এসব দোকানে নারীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে শুধু প্রয়োজন নয়, সৌখিনতার ছোঁয়াও মেলায় সমানভাবে জায়গা করে নিয়েছে।

মেলায় ঢুকতেই চোখে পড়ে বাঁশ-বেতের কারুকাজে সাজানো সারি সারি ঝুড়ি, কুলা, চালুন। আন্দরকিল্লা থেকে লালদিঘি পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা এই বাজার যেন এক চলমান গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি। দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সৌখিন পণ্যের কদরও।

একপ্রান্তে বেতের দোলনা আর নান্দনিক আসবাব, অন্যপ্রান্তে মাটির তৈরি টেরাকোটার শিল্পকর্ম—ফুল, পাখি, মুখোশ কিংবা দেয়ালসজ্জা। রঙ আর নকশার মেলবন্ধনে প্রতিটি স্টল যেন ছোট্ট একটি গ্যালারি। আধুনিক ফ্ল্যাট সংস্কৃতির ভেতরে ঐতিহ্যের ছোঁয়া খুঁজে নিতে ক্রেতাদের আগ্রহও চোখে পড়ার মতো।
একসময় রান্নাঘরের সীমায় আটকে থাকা মাটির পাত্র এখন ঘর সাজানোর অনন্য অনুষঙ্গ। ওয়াল ম্যাট, টব, ফুলদানি, গ্লাস, থালা—সবকিছুতেই বৈচিত্র্য। দাম কিছুটা চড়া হলেও পছন্দের জিনিসটি সংগ্রহে আগ্রহ কম নয়। তরুণ-তরুণীদের হাতে মোবাইল—মেলার প্রতিটি কোণ বন্দি হচ্ছে ছবি আর ভিডিওতে।

ব্যবসায়ীরা জানান, এ বছর দেশীয় পণ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা হস্তশিল্প যোগ করেছে বৈচিত্র্য। কিছু স্টলে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবস্থাও দেখা গেছে—যা সময়ের সঙ্গে তাল মেলানোর ইঙ্গিত দেয়।
মেলায় ঘুরতে আসা শিক্ষার্থী সুমাইয়ার চোখে মেলা মানেই ‘অন্যরকম আনন্দ’। তিনি বলেন, “অনেকদিন ধরে অপেক্ষা করছিলাম। এখানে এলেই মনে হয়, শহরের ভেতরেই একটা আলাদা পৃথিবী আছে।”

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যারা এই মেলার সঙ্গে জড়িয়ে, তাদের কাছে এটি শুধু বেচাকেনার জায়গা নয়—এ এক স্মৃতির ধারাবাহিকতা। সাভার থেকে আসা মঈনুদ্দীন বলেন, “এই মেলা আমাদের রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। বলিখেলা শুরু হলে ভিড় আরও বাড়বে।”
সিনেমা প্যালেস সংলগ্ন এলাকায় কাঠের আসবাবের দোকানেও ভিড় কম নয়। নতুন সংসার সাজাতে কেউ কিনছেন খাট, কেউ টেবিল—দরদাম আর হাসি-ঠাট্টায় জমে উঠছে কেনাবেচা।

বলি খেলার মূল আয়োজন সামনে রেখে এখন যেন পুরো চট্টগ্রাম অপেক্ষার প্রহর গুনছে। আর সেই অপেক্ষাকে রঙিন করে তুলেছে লালদিঘির এই বৈশাখী মেলা—যেখানে ঐতিহ্য, বাণিজ্য আর আনন্দ এক সুতোয় গাঁথা।
