chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

বাকলিয়া সহিংসতার হটস্পট

# মূলে রয়েছে আধিপত্যের লড়াই
# খুন, গুলি, চাঁদাবাজি থেকে মাদক, বাদ নেই কোন অপরাধই

চট্টগ্রাম নগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বাকলিয়া এখন আতঙ্কের আরেক নাম। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব, গ্রুপিং, মাদক ও অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে এলাকাটি ধীরে ধীরে সহিংসতার হটস্পটে পরিণত হচ্ছে। সাম্প্রতিক ধারাবাহিক খুন, গুলি ও সংঘর্ষে সাধারণ মানুষ যেমন ভীত, তেমনি ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়।

স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাকলিয়া থানার রাজাখালী খাল ও সোহরাওয়ার্দী কলোনি এলাকা ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি প্রভাবশালী গ্রুপের মধ্যে আধিপত্যের দ্বন্দ্ব চলে আসছে। এই দ্বন্দ্ব নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও সহিংস রূপ নিয়েছে। এক সময়ের ঘনিষ্ঠ ‘গুরু-শিষ্য’ সম্পর্ক ভেঙে গিয়ে এখন তা সরাসরি রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নিয়েছে।

সর্বশেষ গত ৬ এপ্রিল বুলুয়ার দিঘী পাড় ও বউবাজার এলাকায় সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটে। এতে যুবদলকর্মীকে কবজি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।এই ঘটনার প্রধান আসামি মো. সবুজকে গতকাল গ্রেপ্তার করে র‍্যাব।

এর আগেও ৫ এপ্রিল দুই গ্রুপের সংঘর্ষে অন্তত চারজন আহত হন। যার মধ্যে এক শিশু ছিল। এরও আগে গত ৩০ মার্চ দিনের আলোয় একটি গাড়ির ভেতর দুইজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত বছরের ২৭ অক্টোবর একই এলাকায় সংঘর্ষ ও গুলিতে এক ছাত্রদল কর্মী নিহত এবং আরও অন্তত ১২ জন আহত হন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বালু উত্তোলন, কেবল-ইন্টারনেট ব্যবসা, গার্মেন্টস ঝুট বাণিজ্য, পরিবহন রুট ও মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই মূলত এই সংঘাতের বিস্তার। তক্তারপোল, চর চকতাই, বদমতলী ও জামাই বাজারসহ বেশ কয়েকটি এলাকা মাদক বিক্রির সক্রিয় স্পট হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বাকলিয়ার ঘনবসতি ও সরু গলির জটিল কাঠামো অপরাধীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জামাই বাজার, মইদ্যার মিল, বউবাজার, বলুয়ার দিঘী পাড়, করবানিগঞ্জ ও নোমান কলেজ সংলগ্ন এলাকাগুলোতে অপরাধী নেটওয়ার্কের প্রভাব বেশি। অনেক ক্ষেত্রে বাইরের জেলা থেকে আসা শ্রমিক বা তরুণরা স্থানীয় গ্রুপে জড়িয়ে পড়ছে, যা কিশোর গ্যাং বিস্তারে ভূমিকা রাখছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এতে করে পুরনো গ্রুপগুলোর মধ্যে নতুন করে দখল ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এরই জেরে সংঘর্ষের মাত্রা বেড়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের মতে, শুধুমাত্র অভিযান দিয়ে এই সহিংসতার চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থা এবং সমন্বিত উদ্যোগ।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, সন্ত্রাসীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। কেউ তার নাম ব্যবহার করে অপরাধ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনায় তারা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় স্বাভাবিক চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে। শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যে।

ফরিদা|চখ

এই বিভাগের আরও খবর