chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

ফেনী নদী থেকে বঙ্গোপসাগর

ইছাখালী–ডোমখালী ঘাটে জেলে ও নৌকার কারিগরদের সংগ্রামের গল্প

মিরসরাই উপজেলার ফেনী নদীর তীর থেকে বঙ্গোপসাগরের মোহনা—ইছাখালী ঘাট, ডোমখালী ঘাট, বামুন সুন্দর ঘাট এবং মুহুরী সেচ প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, জেলেদের জীবন যেন নৌকা, জাল আর সাগরকে ঘিরেই আবর্তিত। ভোর থেকে গভীর গভীর রাত পর্যন্ত কারও হাতে হাতুড়ি, কারও হাতে জাল—চলছে জীবিকার সংগ্রাম। চৈত্র মাস জুড়ে নৌকা মেরামত, নতুন নৌকা তৈরি আর জাল বুননের কাজ এখন পুরো এলাকায় একপ্রকার উৎসবে পরিণত হয়েছে। কাঠের গন্ধ, লোহার শব্দ আর জাল বোনার ছন্দে মুখর নদীপাড়। শত বছরের এই পেশা এখনো জেলেদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মিরসরাই উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য মতো এখানে সরকারি নিবন্ধিত ২ হাজার ২৬ জন সমুদ্রে মাছ শিকারি জেলে রয়েছে। নিবন্ধনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে আরও চার শতাধিক জেলে। বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। এদের মধ্যে ৩২ শতাংশ সার্বক্ষণিক এবং ৬৮ শতাংশ খণ্ডকালীন সাগরে মাছ আহরণে নিয়োজিত।

১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত মোট ৫৮ দিন সাগরে সব ধরনের মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই সময়ে বসে নেই জেলেরা। পুরনো নৌকা – জাল মেরামতে ব্যস্ত সময় পার করছে সাগর পাড়ে। ৫ এপ্রিল বিকালে ডোমখালী স্লুইসগেট এলাকায় এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় নৌকার কারিগর প্রিয় নাথ জলদাস (৭৫) এর সাথে। পুরাতন নৌকার কাজ করছেন মনোযোগ সহকারে। তিনি জানান, “৫০ বছর ধরে নৌকা তৈরির কাজ করছেন। নতুন নৌকা- পুরাতন নৌকা তৈরি ও মেরামত চৈত্র মাস জুড়ে ব্যস্ত সময় কাটে। একটি নৌকা মেরামতে ১৫-১৬ দিন লাগে। নৌকার ধরণ বুঝে আলোচনা সাপেক্ষে খরচের চুক্তি হয়। যে নৌকাটি কাজ করছেন সেটি ৩০ হাজার টাকা মেরামত খরচ চুক্তি হয়েছে। সাগরে মাছ কমে যাওয়ায় জেলেরা এ পেশায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে উল্লেখ করেন তিনি। সে জন্য এবার চৈত্র মাসে নৌকার কাজ কমে গেছে, কিছু পুরাতন মেরামত কাজ আছে। নতুন করে নৌকা তৈরি কম হচ্ছে। তা ছাড়া নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আসতে চায় না।” তারা বাপ দাদার পেশায় ভবিষ্যত ভালো দেখছে না। পেশা পরিবর্তন করে ফেলছে ধিরে ধিরে।

প্রিয় নাথ জলদাস (৭৫) জানান, সাগরে আগে যেখানে মাছের নিরাপদ প্রজনন ছিলো, সেখানে এখন শিল্প অঞ্চলের জাহাজের বিচরন। মাছ কিভাবে আসবে। জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন, ৫০ বছর ধরে নৌকার কারিগর হিসেবে কাজ করছেন। এই মৌসুমে একটি পুরাতন নৌকার কাজ করলে ৩৫/ ৪০ হাজার টাকা আয় করেন। তার মধ্যে রং, সামান, সব নিজের। ১৫ / ১৬ দিন সময় লাগে একটি নৌকা মেরামত সম্পন্ন করতে। চৈত্র মাসে নৌকা মেরামত করার সিজন। এখন অনেক কাজ। তবে নতুন করে এ কাজ শিখার আগ্রহ নেই নতুন প্রজন্মের ছেলেদের। বাইরের কারিগর হলে অনেক বেশি টাকা নেন।

সুজন জলদাস বলেন, “আগের মতো মাছ নেই, তবুও জেলেদের নৌকা বানাতেই হয়। কাঠ, লোহা, রঙ—সবকিছুর দাম বেড়েছে। কাজ কমে গেছে তবুও এই পেশা ছাড়তে পারি না।” ঘাটে জাল মেরামত করতে থাকা জেলে সুধারাম জলদাস দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “সারাদিন সাগরে থেকেও মাছ পাই না। তেল কিনি বাকিতে, রাতে খালি নৌকা নিয়ে ফিরতে হয়। একসময় এই নদীতে প্রচুর ইলিশ ছিল। এখন শিল্প এলাকা আর বড় জাহাজের কারণে মাছ কমে গেছে, পরিবেশও নষ্ট হয়েছে।” স্থানীয়দের অভিযোগ, অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ওঠার পর জেলেদের মাছ ধরার এলাকা সংকুচিত হয়েছে। নদীর মোহনায় জাহাজ চলাচলের কারণে মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এক সময় মিরসরাই ছিল দেশের অন্যতম ইলিশ প্রজনন কেন্দ্র, সামুদ্রিক মাছের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু শিল্পায়ন ও দূষণের কারণে সেই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। “এই পেশা ছাড়তে পারি না, আবার টিকেও থাকতে পারছি না।”

ডোমখালী স্লুইসগেট এলাকায় কথা হয় সুধাংশু জলদাস বলেন, আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে অনুরোধ জানাই, আমরা পুর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে খাবো কি, বাঁচবো কিভাবে , আমাদের সন্তানদের পড়ালেখা নেই, তাদের কারিগরি প্রশিক্ষন দিয়ে বাড়ির পাশে অর্থনৈতিক অঞ্চলে চাকুরী দিন। আমরা পরিবার নিয়ে বাঁচতে চাই।

৭০ বছর বয়সী মানিক জলদাস বলেন, “ঋণ করে নৌকা-জাল কিনে সাগরে যাই, কিন্তু খরচ ওঠে না। দস্যুরা জাল কেটে নেয়, চাঁদা দাবি করে। খালি হাতে ফিরলে পরিবার নিয়ে উপোস থাকতে হয়।”

তিনি আরো যোগ করেন ১৫ এপ্রিল থেকে ৫৮ দিন সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। এই সময় সামান্য চাল দেয় সরকার। চাল ছাড়া কি আর কিছু লাগেনা আমাদের সংসারে এ প্রশ্ন রাখেন তিনি । একদিকে এনজিও ঋণের চাপ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় উপকূলীয় জেলে পরিবারগুলো চরম সংকটে পড়েছে।

স্বামীর সাথে নৌকা মেরামত করছেন দিপালী দাস। কাছে গিয়ে জানতে চাইলে দিপালী দাস বলেন, ৯০ হাজার টাকা ঋন নিয়ে আরো কিছু ঘর থেকে দিয়ে নৌকা মেরামত করছেন। একটি নৌকার আয় দিয়ে তাদের পরিবারের ৮ জনের সংসার চলে। দিপালী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, তাদের বয়স হয়েছে, এখন সাগরে মন টানেনা, সংসারের অভাব তাদের দুইজনকে সাগরে টেনে আনে। পরিবারের সবাই মাছ ধরার কাজে জড়িত। তবুও মাছের আয় দিয়ে ঋন পরিশোধ, নৌকার খরচ হিসাব করে সংসারের জন্য আর থাকেনা। এখন সাগরে আগের মতো মাছ নেই। খরচের সাথে মাছ বিক্রির আয় মিলেনা। সরকার যেন আমাদের দিকে ফিরে তাকায়। সাগরে নামলে তাদের জাল কেটে দেয় দস্যুরা। সাথে নৌ পুলিশ আমাদের হয়রানি করে।

৭০ বছর বয়সী বাবুল জলদাস বলেন, আমরা পুর্বপুরুষের পেশা ছাড়তে পারিনি। আমাদের দিকে কে তাকাবে। খালি হাতে ঘাটে ফিরলে তেলের টাকা কোথায়, ঋনের কিস্তির মহাজন বসে থাকে ঘাটে । ঘরে ফিরলে পরিবার নিয়ে উপোস থাকা লাগে। শিক্ষা অভিজ্ঞতা না থাকায় ছেলে মেয়েরা অর্থনৈতিক অঞ্চলে চাকুরী পায়না ।

বাবুল জলদাস এর ছেলে সুজন জলদাস বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমাদের অনুরোধ তিনি যেন মিরসরাই সীতাকুণ্ড উপজেলার জেলেদের পরিবারের দিকে নজর দেন। আমাদের সন্তানদের কারিগরি প্রশিক্ষন দিয়ে শিল্প অঞ্চলে চাকুরীর ব্যবস্থা যেন করেন।

স্থানীয় জেলেরা জানান, মহাজনের ঋণ, জালের খরচ, নৌকা ভাড়া ও তেলের ব্যয়—সব মিলিয়ে জেলেদের জীবন এখন চরম দুর্দশায় ঘেরা । অনেকের ঘরে এখন হাহাকার চলছে। তবুও থেমে থাকেনা জেলেদের জীবন, তাদের স্বপ্নগুলো কখনো ভাসে কখনো মিশে যায় ঢেউয়ের মতো।

মিরসরাই আসনের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন এমপি  জানতে চাইলে বলেন,  মিরসরাই উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলে অনেক জলদাস পরিবার রয়েছে।  তারা সাগরের  মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে সংসার চালায়। আমি স্থানীয় সরকার পরিষদের প্রতিটি স্তরে জনপ্রতিনিধি ছিলাম। সে কারণে জলদাস পরিবার গুলো আমার খুব পরিচিত।  তারা ছেলে মেয়ে পরিবার নিয়ে  অনেক কষ্ট করে জীবিকা নির্বাহ করে। আমি তাদের প্রতি বিশেষ নজর দিতে অনুরোধ জানাবো উপজেলা প্রশাসনকে।  আমি তাদের জন্য স্থায়ীভাবে কিছু করার চেষ্টা করবো। কারণ সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে কাউকে সুবিধা বঞ্চিত রেখে সমাজ কখনো পরিবর্তন হবেনা। সকল নাগরিক সমান সুবিধা ভোগ করবে, করবো কাজ গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ,  এটাই বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষণা।

মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার সোমাইয়া আক্তার জানতে চাইলে বলেন, মিরসরাই উপজেলার বিশাল অংশ উপকূলীয় অঞ্চল। এখানে সাগর ঘিরে জেলেরা যুগযুগ ধরে বসবাস করছে। জেলেরা রাত দিন পরিশ্রমের করে মানুষের স্থানীয় সামুদ্রিক মাছের চাহিদা পুষ্টি যোগান দিচ্ছে। তাদের যুক্তিসঙ্গত দাবি আমরা বিবেচনা করবো। তাদের প্রতি সরকার সব সময় সহনশীল। বর্তমান সরকার শ্রমজীবি জেলেদের আরো বেশি সুযোগ সুবিধার কথা বিবেচনা করছে।

মিরসরাই উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুর রহমান জানান, জেলেদের সাথে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ হয়। তাদের সুবিধা অসুবিধা সব সময় আমরা সরকারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানাই। তাদের ভাতা এবং সুযোগ সুবিধা আরো বাড়ানোর সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। সরকার সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ কালীন সময়ে সহযোগিতা দিচ্ছে। ভবিষ্যতে আরো সুযোগ সুবিধা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে।

চখ/ককন

এই বিভাগের আরও খবর