চট্টগ্রামে ৩ সংস্থার শীর্ষ পদ ঘিরে অস্থিরতা
চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও সেবা খাতের তিন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান—চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ এবং চট্টগ্রাম ওয়াসা—এই তিন সংস্থার শীর্ষ পদকে কেন্দ্র করে অস্বাভাবিক এক প্রতিযোগিতা ও অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি হয়েছে। কোথাও চেয়ারম্যান পদ শূন্য, কোথাও অন্তর্বর্তীকালীন নিয়োগ, আবার কোথাও দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী প্রধানের অভাব—সব মিলিয়ে প্রশাসনিক কাঠামোতে স্থবিরতার পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র লবিং। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নানা মহলে এখন একটাই প্রশ্ন—কে পাচ্ছেন এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো।
রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, নতুন সরকার প্রশাসনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ‘ত্যাগী, ক্লিন ইমেজ ও পরীক্ষিত’ নেতাদের অগ্রাধিকার দিতে পারে—এমন বার্তা ছড়িয়ে পড়তেই দৌড়ঝাঁপ বেড়েছে কয়েকগুণ। কেউ ঢাকায় অবস্থান করে তদবির করছেন, কেউ আবার দলীয় যোগাযোগ জোরদার করছেন। ফলে তিনটি সংস্থার নিয়োগ প্রক্রিয়া এখন শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়, রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) চেয়ারম্যান পদ নিয়ে। বর্তমানে প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম দায়িত্বে থাকলেও তার নিয়োগ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কার হওয়ায় নতুন করে পরিবর্তনের জোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে।
এই পদে ইতোমধ্যে একাধিক প্রভাবশালী নেতার নাম ঘুরছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। আলোচনায় রয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, বর্তমান সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান, যুগ্ম আহ্বায়ক নিয়াজ মোহাম্মদ খান, শওকত আজম খাজা, ইয়াছিন চৌধুরী লিটন, আহমেদ উল আলম চৌধুরী রাসেল এবং ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কর্নেল আজিম উল্লাহ বাহার। এছাড়া সাবেক বোর্ড সদস্য, সাবেক কাউন্সিলরসহ আরও অনেকের নাম অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অতীতে রাজনৈতিক নিয়োগের ধারাবাহিকতায় এবারও দলীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ও আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় নেতাদের মধ্য থেকেই কাউকে বেছে নেওয়া হতে পারে। ফলে এই পদটি ঘিরে প্রতিযোগিতা এখন চরমে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদ শূন্য থাকায় সেখানে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে। সারাদেশে ইতোমধ্যে দুই দফায় ৫৬টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলেও চট্টগ্রাম এখনো সেই তালিকার বাইরে। ফলে এ পদ ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে আলোচনায় থাকা নেতাদের তালিকাও দীর্ঘ। বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও উত্তর জেলার সাবেক আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকার, বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম ফজলুল হক, উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন, দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলহাজ আলী আব্বাস, যুগ্ম আহ্বায়ক নাজমুল মোস্তফা আমিন, বাঁশখালীর বিএনপি নেতা মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা, সদস্য সচিব লায়ন মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন—সবাই রয়েছেন আলোচনায়। এর বাইরে জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন এবং সাবেক সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট ইফতেখার মহসিনসহ আরও কয়েকজনের নাম ঘুরছে।
সূত্র জানায়, প্রথমদিকে গোলাম আকবর খোন্দকারকে প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি এতে আগ্রহী হননি। ফলে বিকল্প প্রার্থী খোঁজার কাজ চলছে। ইতোমধ্যে একাধিক প্রার্থীর বায়োডাটা জমা পড়েছে এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।
এদিকে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদ নিয়ে তৈরি হয়েছে ভিন্ন ধরনের অনিশ্চয়তা। দীর্ঘ দেড় বছর ধরে স্থায়ী এমডি না থাকায় সংস্থাটি অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যেই গত ২৪ মার্চ রাতে এমডি নিয়োগ দিয়ে মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে তা বাতিল করার ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে।
সেদিন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে ঢাকা ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী শওকত মাহমুদকে এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়। এতে সংস্থার অভ্যন্তরে যেমন অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তেমনি বাইরে সমালোচনাও বেড়েছে।
এর আগে দীর্ঘ ১৪ বছর দায়িত্ব পালন শেষে ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর এমডি একেএম ফজলুল্লাহকে অপসারণ করা হয়। এরপর থেকে উপপরিচালক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তাদের দিয়ে দায়িত্ব চালানো হচ্ছে। বর্তমানে ডিএমডি (অর্থ) পদও শূন্য থাকায় আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ওয়াসার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক লবিং তুলনামূলক কম হলেও আমলাতান্ত্রিক ও কারিগরি পর্যায়ে নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। কারণ, সংস্থাটিতে চলমান হাজার কোটি টাকার প্রকল্পগুলোর নিয়ন্ত্রণ এই পদটির ওপর নির্ভর করছে।
তিনটি সংস্থার নেতৃত্ব সংকট চট্টগ্রামের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। নগর পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি তৈরি হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির আশঙ্কাও বাড়ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া না হলে চট্টগ্রামের উন্নয়ন কার্যক্রম আরও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এখন সবার নজর কেন্দ্রের দিকে—শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাচ্ছে এই তিন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার নেতৃত্ব।
ফরিদা|চখ
