নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা: গ্রামে গ্রামে উৎসবের আমেজ
পবিত্র রমজানের শেষ সময় ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে আসন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে পাহাড় আর সমুদ্রঘেরা চট্টগ্রাম জেলার গ্রামগুলোতে বইতে শুরু করেছে উৎসবের আমেজ। রাজধানী ঢাকা কিংবা দেশের বিভিন্ন জেলায় কর্মরত কর্মজীবী মানুষেরা ছুটি পেয়ে ফিরতে শুরু করেছেন নিজ নিজ গ্রামে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয়জনদের সান্নিধ্য পেতে রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল এবং লঞ্চ ঘাটে এখন ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড়। চট্টগ্রামের পটিয়া, হাটহাজারী, রাউজান এবং বাঁশখালীসহ বিভিন্ন উপজেলার গ্রামগুলোতে ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে মানুষের আনাগোনা। দীর্ঘদিন পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা হওয়ায় অনেকের মাঝেই কাজ করছে আবেগ ও আনন্দের মিশ্র অনুভূতি। গ্রামের বাড়িগুলোতে চলছে ঘর পরিষ্কার, বাজার করা এবং আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে ইফতার ও আড্ডার আয়োজন। যারা সারা বছর কাজের প্রয়োজনে শহরের যান্ত্রিকতায় ব্যস্ত থাকেন, তাদের আগমনে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায়। বিকেলের আড্ডায় মেতে উঠছে গ্রামের মোড়গুলো, আর দীর্ঘ বিরতির পর পুরনো বন্ধুদের পেয়ে মেতে উঠছেন সবাই।
নগরীর কদমতলী ও অলঙ্কার মোড় বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, যাত্রীদের দীর্ঘ সারি। অনেকে ট্রেনের টিকিট পেতে আগেভাগেই স্টেশনে ভিড় জমিয়েছেন। প্রিয়জনের জন্য শহরের নামী ব্র্যান্ডের পোশাক কিংবা মিষ্টির প্যাকেট হাতে ঘরে ফিরছেন অনেকে।
ঢাকা থেকে ফেরা বেসরকারি চাকুরিজীবী আসিফ মাহমুদ দৈনিক চট্টলার খবরকে বলেন, সারা বছর যান্ত্রিক শহরে থাকলেও মনটা পড়ে থাকে গ্রামের বাড়িতে। ছুটি পেয়ে পরিবারের সাথে সময় কাটানোর যে আনন্দ, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আমাদের কাছে এটাই আসল উৎসব।
ঢাকা থেকে আসা এনজিও কর্মকর্তা শায়লা শারমিন চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে নেমে বলেন, সারা বছর যান্ত্রিক শহরে কাজ করি ঠিকই, কিন্তু প্রাণটা পড়ে থাকে গ্রামের এই মেঠো পথে। ট্রেনের ঝকঝকানি আর জানলার বাইরে সবুজ প্রকৃতি দেখলেই অর্ধেক ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। বাড়িতে মা অপেক্ষা করছেন, এই অনুভূতিটাই অন্যরকম।
রাউজান উপজেলার নোয়াজিষপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, সারা বছর ঢাকায় চাকরি করি। রমজানের শেষের দিকে কয়েক দিনের ছুটি পেয়ে গ্রামে চলে এসেছি। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পারা সত্যিই অনেক আনন্দের।
একইভাবে ফটিকছড়ি থেকে ঢাকায় কর্মরত মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, শহরের ব্যস্ততার মাঝে পরিবারকে খুব মিস করি। ছুটি পেলেই গ্রামে চলে আসি। গ্রামে এসে মনে হয় যেন ঈদের আনন্দ আগেই শুরু হয়ে গেছে।
ফটিকছড়ির হাইদচকিয়া গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব হাজী মকবুল আহমদ উৎফুল্ল কণ্ঠে জানান, সারা বছর ঘরটা খালি থাকে। ছেলে-মেয়েরা সব ঢাকা আর শহরে থাকে চাকরির খোঁজে। এই উৎসবের সময়টাতে যখন নাতি-নাতনিদের নিয়ে সবাই বাড়ি ফেরে, তখন মনে হয় যেন ঈদ চলে এসেছে। বুড়ো বয়সে এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছু নেই।
এক আন্তঃজেলা বাস চালক করিম মিয়া অলঙ্কার মোড়ে বলেন, রাস্তায় গাড়ির চাপ অনেক বেশি, কিন্তু মানুষের চোখে-মুখে বাড়ি ফেরার যে আনন্দ দেখি, তাতে নিজেদের কষ্ট আর মনে থাকে না। আমরা চেষ্টা করছি সবাই যেন নিরাপদে তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছাতে পারে। আমাদের ছুটি নেই ঠিকই, কিন্তু মানুষকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়াটাও এক ধরনের সওয়াব।
চাটগাঁর এক স্থানীয় বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনসুর আলী বলেন, শহর থেকে মানুষ আসায় গ্রামের বাজারেও এখন ঈদের আমেজ। পোশাকের দোকান থেকে শুরু করে কাঁচাবাজার—সবখানেই এখন তিল ধারণের জায়গা নেই। এলাকার ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এটা একটা বড় আয়ের সুযোগ।
স্থানীয়দের মতে, বছরের এই সময়টায় গ্রামগুলোতে ভিন্ন এক পরিবেশ তৈরি হয়। গ্রামের বাজারগুলোতে মানুষের ভিড় বাড়ছে, সন্ধ্যার পর চায়ের দোকানগুলো জমে উঠছে আড্ডায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী নুরুল হুদা জানান, রমজানের শেষ দিকে গ্রামে মানুষ বেশি আসে। তখন বাজারে কেনাকাটাও বেড়ে যায়। এতে ব্যবসাও ভালো হয়।
গ্রামের প্রবীণরা বলছেন, পরিবারের সবাই একসঙ্গে হলে গ্রাম যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। শিশু-কিশোরদের কোলাহল, আত্মীয়দের আনাগোনা আর সন্ধ্যার আড্ডা মিলিয়ে গ্রামে এখন এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের আশা, ঈদকে সামনে রেখে আগামী কয়েকদিনে আরও অনেক মানুষ শহর থেকে নিজ গ্রামে ফিরবেন, ফলে গ্রামজুড়ে আনন্দের এই আমেজ আরও বাড়বে।
ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে হাইওয়ে পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসন বিভিন্ন পয়েন্টে টহল জোরদার করেছে। যানজট নিরসন এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে, শত কষ্ট আর দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি শেষে নিজ আঙিনায় পা রাখতেই যেন জুড়িয়ে যাচ্ছে সবার প্রাণ। গ্রামগুলো এখন শুধুই হাসি-কান্না আর পুনর্মিলনের এক এক অনন্য মিলনমেলা।
চখ
