পাহাড়ি সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে ফ্রিল্যান্সিংয়ে পূর্বার সাফল্য
বাংলাদেশের পাহাড়ি প্রত্যন্ত অঞ্চলের জীবন এখনো নানা সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ কিংবা স্থায়ী ইন্টারনেট সুবিধা—সবকিছুই সেখানে অপ্রতুল। তবুও অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে প্রতিকূলতাকে জয় করে সাফল্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা সম্ভব। সেই উদাহরণ তৈরি করেছেন পূর্বা চিরান। পাহাড়ের দুর্গম পরিবেশে বসেই আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে কাজ করে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের আলাদা পরিচয়।
পূর্বা চিরানের শৈশব কেটেছে শেরপুর জেলায়।তবে তাঁর বাবা-মা শিক্ষক হওয়াতে কেওক্রাডং এলাকায় কিছুটা পথ পেরিয়ে কণাপাড়াতে বসবাস করতে হয়। পূর্বা ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন একজন ভালো শিক্ষক হওয়ার। শিক্ষাজীবনে তিনি ২০১২ সালে শেরপুরের একটি খ্রিস্টান স্কুল থেকে এসএসসি এবং ২০১৪ সালে শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকা সিদ্ধেশ্বরী কলেজ থেকে ২০২০ সালে অনার্স এবং ২০২২ সালে গাজীপুরের ভাওয়াল সরকারি কলেজ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
পড়াশোনা ও কর্মজীবনের প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় তাকে বাড়ির বাইরে থাকতে হয়েছে।তবে ছুটি পেলেই তিনি ছুটে যেতেন বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা কেওক্রাডংয়ে, যেখানে প্রায় এক যুগ ধরে তার পরিবারের বসবাস। সেখানে গিয়ে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখে তার মনে গভীরভাবে নাড়া দিত। বর্ষা ছাড়া পানির সংকট, নেই বাজারঘাট, নেই নির্ভরযোগ্য নেটওয়ার্ক—এসব বাস্তবতা তাকে ভাবিয়ে তুলত। তখনই তার মনে হতো, সুযোগ পেলে এই মানুষগুলোর জন্য কিছু করার।
২০২২ সালে অনার্স শেষ করার পর তিনি সরকারি চাকরির প্রস্তুতির পাশাপাশি বিকল্প পেশা হিসেবে অনলাইনভিত্তিক কাজের দিকে আগ্রহী হন। এক বন্ধুর মাধ্যমে তিনি প্রথম ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে জানতে পারেন এবং বিষয়টি তাকে নতুন সম্ভাবনার পথ দেখায়।
পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নকরেক আইটি ইনস্টিটিউটের একটি বিজ্ঞাপন তার নজরে আসে। প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা দেখে তিনি গাজীপুরে গিয়ে গ্রাফিক ডিজাইন কোর্সে ভর্তি হন। সেখানে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ডিজিটাল কাজের দক্ষতা অর্জন করেন।
প্রশিক্ষণ শেষ করে পূর্বা চিরান ফিরে যান বান্দরবানের কেওক্রাডং পাহাড়ে। বাংলাদেশের অন্যতম দুর্গম এই এলাকায় বসেই তিনি শুরু করেন ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার।
আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস ফাইভারে তিনি প্রথম অর্ডার পান যুক্তরাষ্ট্রের এক ক্লায়েন্ট থেকে এবং সফলভাবে কাজ সম্পন্ন করেন।
তবে এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। কেওক্রাডং এলাকায় স্থায়ী বিদ্যুৎ ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেটের অভাব ছিল তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে ল্যাপটপ চার্জ দিতে হতো এবং ইন্টারনেট পাওয়ার জন্য তাকে দূরের উঁচু পাহাড়ে যেতে হতো।
প্রতিদিন ল্যাপটপ নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে বসে কাজ করতেন তিনি। কয়েক ঘণ্টা কাজ করার পর চার্জ শেষ হয়ে গেলে আবার নিচে নেমে এসে সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে চার্জ দিয়ে পুনরায় পাহাড়ে উঠতে হতো। একটি প্রজেক্ট সম্পন্ন করতে তাকে অনেক সময় পাঁচ থেকে ছয়বার এভাবে যাতায়াত করতে হয়েছে। কখনো প্রচণ্ড রোদ, কখনো ভারী বৃষ্টি কিংবা পিচ্ছিল পাহাড়ি পথ—সব বাধা পেরিয়েই তিনি কাজ চালিয়ে গেছেন।
কঠিন এই পরিস্থিতিতে অনেক সময় তার মনে হয়েছে সব ছেড়ে দিতে। কিন্তু প্রতিবার কোনো কাজ সফলভাবে শেষ করে যখন ক্লায়েন্টের কাছ থেকে প্রশংসা ও ফাইভ-স্টার রিভিউ পেয়েছেন, তখন সেই স্বীকৃতিই তাকে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দিয়েছে। ধীরে ধীরে তিনি উপলব্ধি করেন—ফ্রিল্যান্সিং শুধু একটি কাজ নয়, এটি হতে পারে একটি সম্ভাবনাময় পেশা।
ফাইভার প্ল্যাটফর্মে কাজ করে পূর্বা চিরান ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন।
তাঁর ক্লায়েন্টদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বর্তমানে তিনি পোস্ট ডিজাইন, ইউটিউব ব্যানারসহ বিভিন্ন ধরনের গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ করে থাকেন।
মার্কেটপ্লেসের বাইরেও তিনি বিভিন্ন এজেন্সির সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করছেন এবং দুটি দেশের স্থায়ী ক্লায়েন্টের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করছেন, যা তার পেশাগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
বর্তমানে পূর্বা নকরেক আইটি ইনস্টিটিউটে একজন দক্ষ প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
নিজের ফ্রিল্যান্সিং কাজের পাশাপাশি তিনি অনলাইন ও অফলাইনে দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষার্থীদের আইটি ও গ্রাফিক ডিজাইনে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে শতাধিক শিক্ষার্থী তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাশাপাশি বর্তমানে গ্ৰাফিক ডিজাইনে পোস্ট ডিজাইন, ব্যানার , ইউটিউব থাম্বনেইল নিয়ে কাজে ব্যস্ততার সময় পার করছেন তিনি।
পূর্বা চিরানের স্বপ্ন কেবল ব্যক্তিগত সফলতায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চান প্রযুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে। ভবিষ্যতে একটি বড় ডিজিটাল এজেন্সি গড়ে তুলে আরও অনেক তরুণকে দক্ষ করে তোলাই তার লক্ষ্য।
দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল দুনিয়ায় নিজের অবস্থান তৈরি করা পূর্বা চিরানের এই গল্প আজ অনেক তরুণের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
চখ/ককন
