chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

চট্টগ্রামে মার্কেটেগুলোতে মানুষের জোয়ার 

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে জমে উঠেছে ঈদ কেনাকাটা। নগরীর বিপণিবিতান, ঐতিহ্যবাহী বাজার ও ফুটপাতের দোকানগুলোতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো নগরী। বিগত সময়ের মতো এবারও পোশাকে রয়েছে ভিন্নতা ও নতুনত্ব। সন্তুষ্ট বিক্রেতারা তবে পোশাকের দরদাম নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে ক্রেতাদের মাঝে।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের বসবাস। নিউমার্কেট, রিয়াজুদ্দিন বাজার, টেরিবাজার ও জিইসিকেন্দ্রিক ছিল এক সময়কার ঈদবাজার। কিন্তু এখন সে বাজার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নগরজুড়ে।

সাধারণ মানুষকে এখন আর দূর-দূরান্তে যেতে হয় না। হাতের কাছেই মার্কেট, কেনাকাটা শেষ করা যাচ্ছে নিকটবর্তী বিপণি কেন্দ্র থেকে। তবে মার্কেটসংখ্যা বেড়েছে বলেই বিক্রিতে কমতি, এমন নয়। বরং প্রতিটি মার্কেটই ঈদ সামনে রেখে এখন উৎসবমুখর। ঈদের আর বেশি দেরি নেই। সকাল থেকেই চলছে বেচাবিক্রি। তবে ইফতারের পর যেন দম ফেলার অবস্থা নেই ব্যবসায়ীদের।

নগরীর প্রাণকেন্দ্র নিউ মার্কেট এলাকায় অবস্থিত বিপণিবিতানগুলোতে নারী, পুরুষ ও শিশুদের পোশাকের নতুন কালেকশন সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। একইভাবে সানমার ওশান সিটি ও মিমি সুপার মার্কেট-এ দেখা গেছে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। বিভিন্ন ধরনের দেশি-বিদেশি আকর্ষণীয় পোশাকের পাশাপাশি নারী তরুণীদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে নানারকম শাড়ি, টপস, লেহেঙ্গাসহ আরামদায়ক সুতি পোশাক। আর পুরুষদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে শার্ট, টি-শার্ট, জিন্স, ট্রাউজার, পাঞ্জাবিসহ বাহারি পোশাক। পাঞ্জাবি, শাড়ি, থ্রি-পিস, কুর্তি, জুতা ও কসমেটিকস সামগ্রীর চাহিদা বেশি বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

নগরীর নিউ মার্কেট এলাকায় কেনাকাটা করতে আসা গৃহিণী সুমাইয়া আক্তার বলেন, দাম আগের তুলনায় একটু বেশি মনে হচ্ছে। তবুও ঈদ বলে কথা—বাচ্চাদের জন্য নতুন জামা না কিনলে মনই মানে না। একসঙ্গে পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটা করতেই এসেছি।

সানমার ওশান সিটি-তে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী রিয়াজ উদ্দিন জানান, অফিসের ব্যস্ততার কারণে আগে আসতে পারিনি। এখন শেষ সময়ে এসে ভিড়ের মধ্যে কেনাকাটা করতে হচ্ছে। তবে কালেকশন ভালো, বিশেষ করে পাঞ্জাবি ও জুতার ডিজাইন পছন্দ হয়েছে।

ঐতিহ্যবাহী পাইকারি ও খুচরা বাজার টেরীবাজার-এও ঈদ উপলক্ষে বেচাকেনা বেড়েছে কয়েকগুণ। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রেতারা সাশ্রয়ী দামে কেনাকাটার জন্য ভিড় করছেন রেয়াজুদ্দিন বাজার ও চকবাজার এলাকায়। দরদাম আর হাসি-আনন্দে মুখর হয়ে উঠেছে এসব এলাকা।
বিক্রেতারা জানান, পাকিস্তানি লন ও এমব্রয়ডারি থ্রি-পিস, ভারতীয় শাড়ি, দেশীয় বুটিক পোশাক, পাঞ্জাবি ও শিশুদের জামা বেশি বিক্রি হচ্ছে। নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে হালকা রঙের কটন ও সিল্কের পোশাকের চাহিদা বেশি। কিশোরী ও তরুণীদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে নতুন নকশার শাড়ি, থ্রি-পিস ও গয়না। পুরুষদের পাঞ্জাবি, শার্ট, জিনসের প্যান্ট ও জুতা বিক্রি হচ্ছে ব্যাপকহারে। শিশুদের জন্য খেলনা ও সাজসজ্জার সামগ্রীর দোকানগুলোতেও ভিড় দেখা গেছে।

চান্দগাঁও এলাকা থেকে স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে কেনাকাটা করতে এসেছেন গৃহিণী রাহেলা বেগম। হাতে মেয়ের জামা আর ছেলের পাঞ্জাবি নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতি বছরই ঈদের আগে এখানে আসি। এক জায়গায় পরিবারের সবার জন্য পোশাক পাওয়া যায়। শপিংমলে গেলে দাম বেশি পড়ে, এখানে দরদাম করার সুযোগ আছে।’

কলেজপড়ুয়া হুমায়ুন কবির বিজয় বন্ধুদের সঙ্গে ঈদের পোশাক দেখতে এসে বলেন, ‘অনলাইনে অনেক কিছু দেখা যায়, কিন্তু কাপড়ের মান বোঝা যায় না। এখানে এসে হাতে নিয়ে দেখা যায়, তাই টেরিবাজারেই কেনাকাটা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।’

আরেক ক্রেতা রেহেনা আকতার বলেন, ‘মেগামার্টে এসেছি পরিবারের সবার জন্য শপিং করবো। তিন হাজার টাকায় থ্রি-পিস কিনেছি। নতুন কালেকশনে দাম বেশি। তবে চট্টগ্রামের অন্যান্য মার্কেটের তুলনায় এখানে দাম মোটামুটি কম।’

বিক্রয় প্রতিষ্ঠান মেগামার্টের শহীদুল নামের এক কর্মী জানান, ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটায় বিশেষ ছাড় চলছে। পাঁচ হাজার টাকার থ্রি-পিস বিক্রি হচ্ছে চার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায়। আড়াই হাজার টাকার থ্রি-পিস বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার থেকে ১৮শ টাকায়।

ঐতিহ্যবাহী টেরীবাজার-এ দরদাম করতে দেখা যায় কলেজছাত্রী তানজিলা রহমানকে। তিনি বলেন, এখানে তুলনামূলক কম দামে ভালো জিনিস পাওয়া যায়। একটু সময় নিয়ে ঘুরলে বাজেটের মধ্যেই কেনাকাটা সম্ভব।”

মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য আবদুল কাদের, যিনি রেয়াজুদ্দিন বাজার থেকে কেনাকাটা করছেন, বলেন, সবকিছুর দামই বেড়েছে। তাই হিসেব করে কিনতে হচ্ছে। তবুও ঈদের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করতে চাই।

অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মাহিন হাসান বলেন, বন্ধুদের সঙ্গে চাঁদরাতে কেনাকাটার আলাদা মজা আছে। রাত পর্যন্ত মার্কেটে ঘুরে নিজের পছন্দমতো পোশাক কেনার অনুভূতিটাই আলাদা।

ব্যবসায়ীরা জানান, রমজানের প্রথম দিকে বেচাকেনা কিছুটা ধীরগতির থাকলেও শেষ সপ্তাহে এসে বিক্রি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিশেষ করে ‘চাঁদরাত’কে কেন্দ্র করে গভীর রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অনেকে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহলও জোরদার করা হয়েছে।

ক্রেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দাম নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ থাকলেও ঈদের আমেজে কেনাকাটার আনন্দে ভাটা পড়েনি। পরিবার-পরিজনের হাসিমুখই যেন সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ঈদকে ঘিরে চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে বইছে উৎসবের হাওয়া। আলোঝলমলে মার্কেট, রঙিন পোশাক আর মানুষের হাসিমুখ—সবকিছু মিলিয়ে জমে উঠেছে এবারের ঈদ কেনাকাটা।

ফখ|চখ

এই বিভাগের আরও খবর