গ্লোবাল হাংগার ইনডেক্স তথ্য
বাংলাদেশের ১১.৯ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে
দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। বর্তমানে মুসলিম সম্প্রদায়ের সিয়াম সাধনার মাস মাহে রমজান চলছে। যদিও অন্যান্য মুসলিম দেশে এ সময় দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার নজির থাকলেও বাংলাদেশে দেখা যায় তার উল্টো চিত্র। রমজান এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম অনেক বেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তারা।
চাল, ডাল, তেল, শাকসবজি, ডিম, ব্রয়লার মুরগিসহ প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে সবজির দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সর্বাধিক বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। সারা দিন রোজা রেখে ইফতার ও সাহরিতে প্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। বেঁচে থাকার জন্য খাবার জুটলেও অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে পুষ্টির চাহিদা, ফলশ্রুতিতে বাড়ছে অসুস্থতা ও নানা রোগের ঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রোটিনের ঘাটতির কারণে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি না মিললে তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এই অপুষ্টি দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক বা গ্লোবাল হাংগার ইনডেক্স (জিএইচআই) ২০২৪ এর- তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের ১১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। শিশু ও নারীর অপুষ্টির হার উদ্বেগজনক।
দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশের বেশি খাদ্য-নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অপুষ্টিজনিত কারণে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং ৩ শতাংশ শিশু জšে§র পাঁচ বছরের মধ্যে মারা যাচ্ছে। অপুষ্টির ফলে দেশে ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার শিশু খর্বাকায় এবং ১১ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টির শিকার হয়েছে। অপুষ্টি ও খাদ্য-নিরাপত্তাহীনতা গ্রামীণ ও শহরতলীর নারীদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। নারীদের পুষ্টির ঘাটতি পরবর্তীকালে গর্ভজাত শিশুর জন্যও ক্ষতিকর।
ইউএসএআইডির তথ্যমতে, বাংলাদেশে ৫০ শতাংশ গর্ভবতী মা ও শিশু আগেই পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ খাবারের পরিমাণ কমাতে বাধ্য হলে ভবিষ্যতে পুষ্টিহীনতার পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে। দেশে গরিবের প্রোটিন হিসেবে পরিচিত ডিম ও দুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশু-কিশোরদের ওপর।
এ বিষয়ে কথা হয় সুরভী নামে একজন গৃহপরিচারিকার সঙ্গে। তিনি জানান, বাজারে সবকিছুর দাম এত বেড়েছে যে, ঠিকমতো নিত্যপ্রয়োজনী অনেক কিছুই কেনা যায় না। একটা সময় ভাতের সঙ্গে লবণ-মরিচ দিয়েই দিন পার করতে হয়েছে। এখন কাঁচা মরিচের দামও বেশি, যে কারণে কাঁচা মরিচের বদলে শুকনা মরিচ দিয়ে ভাত খেতে হচ্ছে। বাসা-বাড়িতে কাজ করে যে টাকা পান তা দিয়ে ঘর ভাড়া দেন আর গ্রামে মা ও সন্তানদের জন্য পাঠান। মাঝে মাঝে শরীর দুর্বল লাগে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে গৃহকর্মী নার্গিস বেগম জানান, ছয় সদস্যের পরিবারে তার তিন সন্তান ও বৃদ্ধা শাশুড়ি রয়েছে। তিনি মাসে ১০ হাজার টাকা আয় করেন, স্বামী রিকশা চালিয়ে আয় করেন ১৫ হাজার টাকা। স্বামী-স্ত্রী দুজনের ২৫ হাজার টাকায় আগে সংসার চললেও এখন কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিদিনের পুষ্টিকর খাদ্যের তালিকায় শর্করা, আমিষ, ভিটামিন, খনিজ, পানি ও চর্বিÑএই ছয় ধরনের উপাদানের সমন্বয় প্রয়োজন। দৈনিক খাদ্যে ৫০-৬০ শতাংশ শর্করা, ১৫ শতাংশ আমিষ ও ৩০-৩৫ শতাংশ স্নেহজাতীয় খাবার থাকা দরকার। সুষম খাবারের ঘাটতি হলে তা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং দীর্ঘমেয়াদে কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়।ল্যাবএইড হাসপাতালের পুষ্টিবিদ সামিয়া তাসনিম শেয়ার বিজকে বলেন, দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষ কেবল পেট ভরার জন্য খাবেন কিন্তু এতে পুষ্টি নিশ্চিত হয় না। তারা মূলত শর্করা নির্ভর খাবার খান কিন্তু প্রোটিনের ঘাটতি থেকে যায়। ফলে আয়রনের ঘাটতি দেখা দেয়, রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ওজন কমে, শিশুদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং পেশির গঠন ঠিকমতো হয় না।
তিনি আরও বলেন, ফল কিনতে না পারলে রঙিন শাকসবজি থেকে ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যায়Ñগাজর, মিষ্টি কুমড়া, বিট রুট ফলের বিকল্প পুষ্টির উৎস হতে পারে। মাছ-মাংস বা দুধ কেনা সম্ভব না হলে ডিম ও ডাল থেকে প্রোটিনের ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে। ডাল সহজলভ্য হওয়ায় পরিবারের সবাই তা খেতে পারেন।
ফখ/চখ
