সীমান্তঘেঁষা নাইক্ষ্যংছড়িতে শেষ মুহূর্তে নির্বাচনী প্রস্তুতি সম্পন্ন
বহু প্রতীক্ষার পর আগামীকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬। পার্বত্য জেলা বান্দরবানের ৭টি উপজেলা—বান্দরবান সদর, লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি নিয়ে গঠিত দেশের সর্বশেষ ৩০০ নম্বর আসনে ভোটগ্রহণ ঘিরে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি।
বান্দরবানে মোট ঝুঁকিপূর্ণ ১৫৮ টি কন্দ্রের মধ্যে নাইক্ষ্যংছড়িতে ১৮ টি
দুর্গম ১১ কেন্দ্রে হেলিকপ্টারে পৌঁছালো নির্বাচনী সরঞ্জাম
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবানের মোট ১৫৮টি কেন্দ্রকে যাতায়াত ব্যবস্থা ও ভোটার বিন্যাস বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সীমান্তবর্তী উপজেলা নাইক্ষ্যংছড়িতেই রয়েছে ১৮টি কেন্দ্র।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় মোট ভোটকেন্দ্র ২৬টি, কক্ষ সংখ্যা ১০৪টি এবং মোট ভোটার ৪৮ হাজার ২৭৪ জন। এর মধ্যে আনুমানিক পুরুষ ভোটার ২৩ হাজার এবং মহিলা ভোটার ২৪ হাজার। প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে প্রিজাইডিং অফিসার, চারজন করে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং আটজন করে পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন। সব মিলিয়ে ২৬ জন প্রিজাইডিং অফিসার, ১০৪ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও ২০৮ জন পোলিং অফিসার মাঠে থাকছেন।
প্রস্তুতি সম্পন্ন, কঠোর নিরাপত্তা বলয়
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, ব্যালট পেপার, সীল, প্রয়োজনীয় ফরমসহ সব ধরনের নির্বাচনী লজিস্টিকস ইতোমধ্যে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে এবং বুধবার সকাল থেকে দূরবর্তী কেন্দ্রগুলোতে নির্বাচনী সামগ্রী পাঠানো শুরু হয়েছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. মাঈনুল ইসলাম বলেন, ভোটগ্রহণের জন্য সব ধরনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। নির্ধারিত সময়েই ভোট শুরু হবে এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শেষ হবে বলে আমরা আশাবাদী।
সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ভোটের প্রস্তুতি যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আপাতত কোনো ধরনের সমস্যা বা শঙ্কা আমরা দেখছি না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতোমধ্যে নিজ নিজ কেন্দ্রে টহল জোরদার করেছে। বুধবার থেকে আরও নিবিড়ভাবে কেন্দ্রগুলো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, যেন কোথাও কোনো গণ্ডগোল না হয় এবং সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করা যায়।
তিনি আরও বলেন, ভোট গণনা শেষে ফলাফল যথাসময়ে প্রেরণ করা হবে। ফলাফল প্রকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।
বিজিবি, র্যাব, পুলিশ, আনসার—মাঠে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা
নির্বাচনকে ঘিরে সীমান্তঘেঁষা এই উপজেলায় বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিজিবি, র্যাব, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের পাশাপাশি স্ট্রাইকিং ফোর্স ও মোবাইল টিম মাঠে থাকবে। সহিংসতা বা যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল টিম।প্রশাসন বলছে, ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ১৮টি কেন্দ্রে অতিরিক্ত নজরদারি ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি উপস্থিতি থাকবে।
দুর্গম ১১ কেন্দ্রে হেলিকপ্টার
এদিকে ৩০০ নম্বর আসনের আওতাধীন বান্দরবান জেলার অত্যন্ত দুর্গম ১১টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ও নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে হেলিকপ্টার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।
বান্দরবান জেলা নির্বাচন অফিসার মো. কামরুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ১১টি কেন্দ্রে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে নির্বাচনী সামগ্রী আনা-নেওয়া করা হবে। নিরাপদ ও সময়মতো সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে নাইক্ষ্যংছড়ির ২৬টি কেন্দ্রে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হবে না। এসব কেন্দ্রে জীপ ও বাসযোগে নির্বাচনী সামগ্রী পরিবহন করা হচ্ছে।
পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যম
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় কোনো বিদেশি পর্যবেক্ষক থাকছেন না। দেশীয় পর্যবেক্ষকরা উপস্থিত থাকবেন। সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কোনো মিডিয়া সেন্টার বা বিশেষ নির্দেশনা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কেন্দ্র স্থগিতের সম্ভাবনা নেই
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমানে কোনো কেন্দ্র স্থগিত বা স্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। সব কেন্দ্রেই নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
সীমান্তবর্তী ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে অতীতে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও এবার প্রশাসন বলছে—কঠোর নিরাপত্তা, লজিস্টিক প্রস্তুতি ও সমন্বিত নজরদারির মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।
এখন দেখার বিষয়, কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য দিয়ে পার্বত্য বান্দরবানের এই স্পর্শকাতর আসনে ভোট কতটা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয় এবং ভোটার উপস্থিতি কতটা প্রাণবন্ত থাকে।
চখ/ককন
