প্রচারণায় তুঙ্গে নির্বাচনী হাওয়া
আঞ্চলিক দলহীন রাঙ্গামাটিতে জটিল ভোটের সমীকরণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির ২৯৯ নম্বর সংসদীয় আসনে ধীরে ধীরে জমে উঠছে নির্বাচনী প্রচারণা। জেলা ও উপজেলার বাজার, গ্রাম ও পাড়ায় পাড়ায় ইশতেহার বিতরণ, গণসংযোগ, পথসভা ও ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী আমেজ তৈরি হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মাইকিংসহ প্রচার কার্যক্রম চালাচ্ছেন প্রার্থীরা।
তবে মাঠে সাতজন প্রার্থী থাকলেও ভোটারদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, এবার এ আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো প্রার্থী না থাকায় এর প্রধান কারণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। পাহাড়ি এলাকায় নির্বাচনের ফল নির্ধারণে আঞ্চলিক দলের প্রার্থী সবসময়ই বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। কিন্তু এবার তারা নির্বাচনে না থাকায় ভোটের প্রচলিত হিসাব পুরোপুরি বদলে গেছে।
রাজনীতিসংশ্লিষ্টদের মতে, ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী পরিবর্তনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমিয়ে দিয়েছে। বাস্তবতা ও আঞ্চলিক সমীকরণ বিবেচনায় বিএনপির প্রার্থীর শক্ত অবস্থান রয়েছে। তবে নিরব বিপ্লব ঘটে যাওয়ারও সম্ভবনাকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জেলা রাঙ্গামাটি দশটি উপজেলা নিয়ে গঠিত হলেও রয়েছে একটি মাত্র সংসদীয় আসন। চারটি উপজেলার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ থাকলেও ছয়টি উপজেলার মানুষকে এখনো নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয়। খাগড়াছড়ি হয়ে বাঘাইছড়ি ও লংগদুর কিছু এলাকায় সীমিত সড়ক যোগাযোগ রয়েছে, যা প্রচারণাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জোট প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলে চূড়ান্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় সাতজন। এর মধ্যে ছয়জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী।
রাঙ্গামাটি বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন। অন্যদিকে গণতন্ত্র মঞ্চের সমর্থিত বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির মনোনীত সংসদ সদস্য প্রতিদ্বন্দ্বি একমাত্র নারী প্রার্থী জুঁই চাকমাও কোদাল প্রতীক নিয়ে জেলার বিভিন্ন উপজেলার দূর্গম পাহাড়ী এলাকায় নেতাকর্মী ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দদের নিয়ে ব্যাপক ভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মনোনীত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিক রিক্সা প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছে।
এদিকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী অশোক তালুকদার লাঙ্গল প্রতীক, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী জসিম উদ্দিন হাতপাখা প্রতীক এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেলা চাকমা ফুটবল প্রতীক নিয়ে সীমিত পরিসরে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী আবুল বাশার বাদশা ট্রাক প্রতীকের কোন প্রচারনা এখনো চোখে পড়েনি।
এবার এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটের আসন সমঝোতার সিদ্ধান্তে রাঙ্গামাটির ২৯৯নং আসনটির নির্বাচনী হিসাব বদলে গেছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গণে ব্যাপক আলোচনা হিসাব নিকাশ চলছে। বিশেষ করে নতুন আলোচনার উঠে এসেছেন খেলাফত মজলিশের প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিক। পাহাড়ের বিভিন্ন আন্দোলনে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত এই নেতা ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। জোটের আসন ভাগাভাগির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাঙ্গামাটি আসনটি খেলাফত মজলিশের ভাগে পড়ায় জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী এ্যাডভোকেট মোখতার আহমেদ মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন।
তবে জামায়াত জোটের দাবি বিনা চ্যালেঞ্জে ছাড় পাবে না বিএনপি প্রার্থী। আঞ্চলিক দলের প্রার্থী না থাকলেও সাধারণ পাহাড়ি বাঙালি ১১ দলীয় জোটের দিকে ঝুঁকবে। মানুষ সারা দেশের ন্যায় পাহাড়েও জুলাই বিপ্লবের চেতনাবাহী ১১ দলীয় জোটের পক্ষে ব্যালট বিপ্লব ঘটাতে পারে বলে মনে করেন জোটের নেতারা।
রাঙ্গামাটি জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মনসুরুল হক বলেন, প্রার্থী পরিবর্তন হওয়ায ১১ দলীয় জোটে কোন সমস্যা নেই। পাহাড়িদের আঞ্চলিক সংগঠন প্রার্থী না দিলেও তাদের সাধারণ ভোটাররা উন্মুক্ত। এবার পাহাড়ি বাঙালি সকলেই ইনসাফের বাংলাদেশ গড়তে ১১ দলীয় জোটকে সমর্থন দেবে। তিনি বলেন প্রচারণায় আমরা সাধারণ মানুষের বিপুল সমর্থন পাচ্ছি। ১১ দলীয় জোট প্রার্থী এই আসনে জয়ের চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে আছে।
রাঙ্গামাটি আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী দীপেন দেওয়ান বলেন বিএনপি একটি বড় দল। জনগণের ভোট নিয়ে বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাবে। তিনি বলেন ভোটের মাঠে কাউকে আমরা ছোট ভাবে দেখছি না। যে কোনো প্রার্থীকে মোকাবেলা করে ভোটে জয় যুক্ত হবে বিএনপি।
তবে দেশের সবচেয়ে বড় জেলা ২৯৯ নং রাঙ্গামাটি আসনের ভোটারদের মতে এ আসনের যেসব প্রার্থী প্রতিদ্বন্দিতা করছে সব বিবেচনায় বিএনপি মনোনীত প্রাথী দীপেন দেওয়ান ধানের শীষ প্রতীকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অনেকটাই নিশ্চিত জয়ের পথে। ভোটাররা অপেক্ষা করছে দ্বিতীয় বা নিকটতম প্রতিদ্বন্দি কে হবেন।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোপশ নানা ইস্যুকে কেন্দ্রে করে কিছুদিন পরপর অনেকটাই অশান্ত হয়ে উঠছে পার্বত্য অঞ্চল। সংঘাত-সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনাও বেড়েছে গত দেড় বছরে। যে কারণে ভোটারদের অনেকেই বলেছেন, এই নির্বাচনে যারাই জিতুক, তারা যেন অন্তত পাহাড়ে শান্তি ও সম্প্রীতি ফেরাতে কাজ করেন।
চখ/ককন
