ভোটে প্রভাব ফেলবে পূর্বের প্রতিশ্রুতি ও অর্জন
সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামে লড়ছেন সাবেক ৬ এমপি
চট্টগ্রামের নির্বাচনী রাজনীতিতে এবার দৃশ্যত এক ধরনের পুনরাবৃত্তি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নগর ও জেলার বিভিন্ন আসনে লড়াইয়ে নেমেছেন অন্তত ছয়জন সাবেক সংসদ সদস্য। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর এই প্রবীণ রাজনীতিকরা ভোটারদের কাছে হাজির হচ্ছেন অভিজ্ঞতার ঝুলি হাতে নিয়ে। কিন্তু দুই দশকের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় বলা যায়, শুধু অভিজ্ঞতা নয়, এখন ভোটাররা খুঁজছেন হিসাব। প্রতিশ্রুতি কতটা রাখা হয়েছে, আর কতটা ছিল সময় পার করার বুলি।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামার ৮ নম্বর অনুচ্ছেদ এবার চট্টগ্রামের ভোটের মাঠে সবচেয়ে আলোচিত দলিল হয়ে উঠেছে। কারণ এই অংশেই প্রার্থীদের আগের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন, দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের চিত্র তুলে ধরার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাস্তবে এখানেই ধরা পড়ছে রাজনৈতিক দাবির শক্তি ও দুর্বলতা।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নিজেকে উন্নয়নমুখী রাজনীতিক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি শতভাগ বাস্তবায়নের দাবি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। অবকাঠামো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেড়িবাঁধ নির্মাণের কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই উন্নয়ন কতটা সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নে প্রভাব ফেলেছে, আর কতটা ছিল নগরকেন্দ্রিক ও পুঁজিনির্ভর উদ্যোগ।
জামায়াতে ইসলামীর শাহজাহান চৌধুরী তাঁর হলফনামায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সামনে এনেছেন। কলেজ, মহিলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ফায়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠার দাবি আছে। কিন্তু বাস্তবায়নের হার, সময়কাল বা বর্তমান অবস্থার কোনো সুস্পষ্ট তথ্য নেই। ফলে ভোটারদের কাছে এই উন্নয়ন তালিকা তথ্যের চেয়ে আশ্বাস হিসেবেই বেশি ধরা পড়ছে।
চট্টগ্রাম-১৩ আসনের প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম দাবি করেছেন, তিনি সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন। কিন্তু কোন প্রকল্পে, কীভাবে, কত সময়ের মধ্যে—তার কোনো নির্দিষ্ট বিবরণ নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সর্বজনীন সাফল্যের দাবি যাচাইযোগ্য তথ্য ছাড়া ভোটারদের সন্তুষ্ট করতে পারছে না।
সন্দ্বীপ আসনের বিএনপি প্রার্থী মোস্তফা কামাল পাশার হলফনামা তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী। তিনি স্বীকার করেছেন, সব প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। সন্ত্রাস দমনে ৮০ শতাংশ সাফল্যের দাবি থাকলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাতে মাত্র ৫০ শতাংশ বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। এই স্বীকারোক্তি একদিকে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়, অন্যদিকে প্রশ্ন তোলে—একাধিক মেয়াদ সংসদ সদস্য থেকেও কেন অর্ধেক কাজ অপূর্ণ রয়ে গেল।
চট্টগ্রাম-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী গোলাম আকবর খন্দকারের হলফনামায় সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন বিষয়ে কার্যত কোনো তথ্যের অনুপস্থিতি। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার থাকা সত্ত্বেও এই নীরবতা ভোটারদের মনে সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে।
একই আসনের বিএনপির আরেক প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি নতুন সড়ক নির্মাণে ৮০ শতাংশ, সেতু ও সড়ক সংস্কারে ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ বাস্তবায়নের দাবি করেছেন।
এই ছয় সাবেক এমপির হলফনামা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ, কিন্তু তার বাস্তবায়ন মাপার মতো স্বচ্ছ মানদণ্ড এখনো অনুপস্থিত। কোথাও শতভাগ সফলতার দাবি, কোথাও অর্ধেক কাজের স্বীকারোক্তি, আবার কোথাও সম্পূর্ণ নীরবতা। এমন অবস্থায় ভোটারদের সামনে প্রতিশ্রুতির হিসাব মিলিয়ে ভোট দেওয়ার প্রসঙ্গটি আবার সামনে আসছে।
ফখ|চখ
