chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

মানুষের পাশাপাশি তীব্র শীতে কাবু চিড়িয়াখানার পশুপাখিরাও

পৌষের বিদায়ের সন্ধিক্ষণে তীব্র শীতে কাঁপছে চট্টগ্রামসহ পুরো দেশ।জানুয়ারির শুরু থেকে বন্দনগরীতে বেড়েছে হাড়কাঁপানো শীতের প্রকোপ। গত শনিবার চট্টগ্রাম নগরীতে সর্বনিন্ম তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাতে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নেমে যায়।এক সপ্তাহ ধরে চলমান এমন পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে শহরের ছিন্নমূল মানুষ থেকে শুরু করে প্রাণীকূলেও।কনকনে ঠান্ডা বাতাসে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার পশু-পাখিরাও হয়ে পড়েছে জবুথবু।

গতকাল সোমবার (৫জানুয়ারি) সরেজমিনে নগরীর ফয়েস লেক এলাকার ‘চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা’ ঘুরে দেখা যায়, তীব্র শীতে পশুপাখিরা বেশ ভোগান্তিতে পড়েছে। শীতের প্রভাবে অনেক প্রাণী শরীর ফুলিয়ে জবুথবু হয়ে বসে থাকতে দেখা গেছে। এর মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, বানর, উটপাখি ও ময়ূর উল্লেখযোগ্য। শীতের কনকনে আবহাওয়ায় হরিণ, জেব্রা, বাঘ, বানর ও সিংহসহ প্রায় সব পশুপাখিকেই কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানান, এই শীতে প্রাণীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত ভিটামিন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করা হচ্ছে।
শীতের তীব্রতা কমাতে বিভিন্ন খাঁচার ভেতর খড় ও বালুর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার ফলে পশুপাখিরা কিছুটা হলেও ঠান্ডা থেকে স্বস্তি পাচ্ছে। পাশাপাশি খাঁচার ভেতরে ছোট ছোট বক্স তৈরি করে দেওয়া হয়েছে আশ্রয়ের জন্য।বনের প্রাণীদের মতো দৌড়ঝাঁপ করে শরীর গরম করার সুযোগ না থাকায় চিড়িয়াখানার পশুপাখিদের শীত কাটাতে এসব বাড়তি ব্যবস্থাই একমাত্র ভরসা।
এদিকে বাঘ, সিংহ, জেব্রা, হরিণ ও বানরসহ বিভিন্ন প্রাণীকে খাঁচার একপাশে নীরবে জড়োসড়ো হয়ে থাকতে দেখা গেছে। ঠান্ডা থেকে বাঁচতে খাঁচার একটি অংশে খড় বিছানো হলেও কয়েকটি জেব্রা ছাড়া অধিকাংশ জেব্রা মাটিতেই শুয়ে থাকতে দেখা যায়। চঞ্চল বানরগুলোও লাফালাফি বাদ দিয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শরীরের উষ্ণতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। বিশালদেহি উটপাখিরাও শীতের প্রভাবে নিথর হয়ে বসে আছে। হরিণগুলো দলবদ্ধ অবস্থায় থাকলেও শীতের কারণে তাদের স্বাভাবিক চাঞ্চল্য চোখে পড়ছে না। সব মিলিয়ে চিড়িয়াখানার অধিকাংশ প্রাণীকেই শীতের কষ্টে জবুথবু অবস্থায় দেখা যাচ্ছে।
সেখানে ঘুরতে আসা রাশেদ নামে এক দর্শনার্থী বলেন, ‘নগরীতে এমন তীব্র শীত আমি আর দেখি নাই। এমন শীতে মানুষ গরম কাপড় পড়েও টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে, সেখানে এসব অবলা প্রাণীদের দেখে মনে হচ্ছে তাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে।’
সুমন মিয়া নামে আরেক দর্শনার্থী বলেন, শীতের কারণে শুধু মানুষ নয় পশুপাখিরাও কষ্টে রয়েছে। এটা এখানে এসে খুব বেশি উপলব্ধি করছি। তীব্র ঠাণ্ডায় আমাদের হাত-পা কোঁকড়া হয়ে আসছে। মানুষের মতো প্রাণিকুলের অবস্থাও নাজুক। চিড়িয়াখানার বেশিরভাগ প্রাণীর মধ্যে শীতের কারণে দুরন্তপনা নেই। শীতে নিদারুণ কষ্টে থাকা এসব প্রাণী দেখে খুব বেশি আনন্দ পাওয়া যায় না।
শীতে চিড়িয়াখানার প্রাণীদের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ডাঃ মোঃ শাহদাত হোসেন শুভ দৈনিক চট্টলার খবরকে বলেন, ‘পশুপাখিদের ঘুমানোর জায়গায় খড় দেওয়া আছে।আর কিছু এনিম্যাল আছে এদেরকে খড় যতই দেওয়া হয় এরা এতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না।এরা খড় সব ফেলে দেয়।যেমন, বানর।যখন অতিরিক্ত শীত পড়ে তখন ওরা কি করে? গরম পড়লে পানিতে থাকে, শীতকালে পাশাপাশি এক বানর আরেক বানরকে জড়িয়ে ধরে থাকে।যাতে হিট ট্রান্সফার হয় এবং হিটটা যাতে বেশি থাকে। পাখির যেহেতু পুরোটাই ফেদার দিয়ে ঢাকা, পাখির ক্ষেত্রে এখানে কিছু জায়গায় কেজ আছে, খড় দেওয়া আছে ওই জায়গায় থাকে।’
শীতের আগমনকে ঘিরে ওই পশুপাখিদের কি কোনো নতুন রোগের আক্রমণ বা এরকম কোনো আশঙ্কা আছে কি না? যদি থাকে সেক্ষেত্রে কোনো ধরনের নতুন উদ্যোগ আছে কি না আপনাদের? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, এখন পর্যন্ত কোনো এনিম্যাল অসুস্থ হয়নি। আর যেটা আমাদের নরমাল যেটা পরিচর্যা, ওটা তো সারাবছরই করতে হয়। শীতের ক্ষেত্রে আমরা কিছু এনিম্যাল আছে স্পেসিফিক এদেরকে আমাদের আলাদা করে খড় দিতে হয় গরমের জন্য। কিছু এনিম্যাল আছে রাতে বেলা আমরা লাইট দিই, যেমন ধরেন খরগোশ, গিনিপিগ। আর খাবারের সাথে আমরা এক্সট্রা করে ভিটামিন আর গ্লুকোজ দেওয়া হয়,যাতে শরীরটা গরম থাকে।’
এদিকে, শীতের তীব্রতা আগামী এক সপ্তাহ থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের (পতেঙ্গা অফিস) পূর্বাভাস কর্মকর্তা বিশ্বজিত চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে শনিবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাতে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নেমে যায়। তখনকার পরিস্থিতিকে শৈত্যপ্রবাহ বলা যায়। এখন একটু বেশি শীত অনুভব হচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে এমনটি চলছে। আগামী এক সপ্তাহ পর্যন্ত তাপমাত্রা ১২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে থাকবে।’
তিনি বলেন, ’১২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস চট্টগ্রাম অঞ্চলের জন্য সর্বনিম্ন। চলতি সপ্তাহের মধ্যে আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। বাতাসের কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি শীত অনুভব হচ্ছে। বাতাস কেটে গেলে শীতের তীব্রতা কম অনুভূত হবে।’

উল্লেখ্য, জেলা প্রশাসন চট্টগ্রামের ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রাম জেলার একমাত্র বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, গবেষণা, শিক্ষা ও বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। ১০.২ একর ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই চিড়িয়াখানায় রয়েছে বাঘ, সিংহ, জেব্রা, ভল্লুক, হরিণ (চিত্রা, সাম্বার, মায়া), উল্লুক, রেসাস বানর, মেছো বিড়াল, চিতা বিড়াল, অজগর, বাঘডাস, উঠপাখি, ইমু, গয়াল, কুমির, ময়ূর, ঘোড়া ,বক, টিয়া সহ ৬৬ প্রজাতির ৫২০টি পশুপাখি।
খাঁচায় বন্দি প্রাণীদের খুব কাছ থেকে দেখার বাসনা মানুষের স্বভাবজাত। চিড়িয়াখানার এসব প্রাণীরা মানুষের বিনোদনের খোঁড়াক যোগায় আর তাদের যত্মের কমতি হলেই ঘটে মৃত্যুর মতো বিপত্তি।

চখ/ককন

এই বিভাগের আরও খবর