chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

চট্টগ্রামে এলপিজির দাম নিয়ে চলছে তেলেসমাতি

২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর সবশেষ সমন্বয় করা হয় এলপি গ্যাসের দাম। সে সময় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৩৮ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ২৫৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়। নতুন করে জানুয়ারি মাসের এলপিজি গ্যাসের দাম নির্ধারণ করার কথা রয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিআরসি)। কিন্তু তার আগেই দেশের বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলমান এ সংকটের কারণে বাজারে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়ে। আবার কোথাও কোথাও অতিরিক্ত দাম দিয়েও মিলছে না রান্না করার এ গ্যাস। ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। কিন্তু এতে করে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক দিন আগেও যে সিলিন্ডার ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, সেটিই এখন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৫০ টাকায়। এলাকাভেদে দামের এই তারতম্য আরও প্রশ্ন তুলছে এলপিজি বাজারের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে।

তবে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই এমন মূল্যবৃদ্ধিতে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। বিশেষ করে শহর ও মফস্বলের মধ্যবিত্ত ও নিন্ম আয়ের পরিবারগুলোর রান্নাঘরের খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ।

ভোক্তারা অভিযোগ করছেন, সরকারনির্ধারিত দামের কোনো তোয়াক্কা না করেই ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা নিজেদের মতো করে দাম নির্ধারণ করছেন।

আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হাসান বলেন, ‘কাল ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে চরম বিপকে পড়েছি। এতদিন সরকারনির্ধারিত দামের চাইতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি নিয়ে যেতাম। কিন্তু আজ ২ হাজারের এক টাকা কমেও বিক্রেতারা দিতে চাইছেন না। কয়েকটি দোকান ঘুরে বাসায় ফিরে এলাম। হঠাৎ করে সিলিন্ডারের দাম এতটা বেড়ে যাবে, কেউ জানায়নি। গ্যাস নেই বলে এলপিজির ওপর নির্ভর করতে হয়, কিন্তু এখন সেটাও নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।’

একই অভিযোগ করেন বাকলিয়ার বাসিন্দা অনামিকা বিশ্বাস। প্রতি মাসে রান্নার জন্য এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হয়। সরকারনির্ধারিত দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা। পরিবহন খরচ মিলিয়ে বড়জোর ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি হতে পারে। কিন্তু এ মাসে আমাকে ২ হাজার টাকায় কিনতে হয়েছে। এবার সিলিন্ডারের আকাশচুম্বী দাম দেখে তিনি বিস্মিত।

নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে প্রতি সিলিন্ডার এলপিজি ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদিও ভোক্তাদের সব সময়ই নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা বাড়তি খরচ করতে হয়। তবে, এবারের মূল্যবৃদ্ধি পূর্বের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। চড়া দামের পাশাপাশি বাজারের বিভিন্ন স্থানে এলপিজি সিলিন্ডারের তীব্র সংকটও দেখা দিয়েছে।

একই চিত্র দেখা গেছে চকবাজার এলাকায়। সেখানকার বাসিন্দা মো.আবরার জানান, তিনি একটি সিলিন্ডার কিনেছেন ১ হাজার ৮০০ টাকায়। এর চেয়ে কম দামে কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। আগে দেখা যেত, কিছু কিছু কোম্পানি তুলনামূলক কম দামে গ্যাস দিত, কিন্তু এখন সবারই এক দাম। দামের চেয়েও বড় সমস্যা হলো, অনেক দোকানে এখন সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।

নগরীর প্রায় সব এলাকায় এখন সিলিন্ডার গ্যাসের উচ্চমূল্য ও সংকটের একই চিত্র। মূলত যাদের বাড়িতে পাইপলাইনে গ্যাসের সংযোগ নেই, তারাই এলপিজির প্রধান গ্রাহক। রান্নাবান্নাসহ প্রতিদিনের জরুরি প্রয়োজনে এই গ্যাসের বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়ে হাজারো পরিবারকে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে বিক্রেতারা দাবি করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ এবং কোম্পানিগুলোর সরবরাহমূল্য বাড়ানোর কারণেই খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। তবে ভোক্তাদের প্রশ্ন, এই মূল্যবৃদ্ধি কেন নিয়ন্ত্রিত নয়, আর কেন একই পণ্যের দাম একেক এলাকায় একেক রকম?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলপিজি খাত এখনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও শক্তিশালী মনিটরিংয়ের বাইরে রয়ে গেছে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিশ্লেষক অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘স্পষ্ট নীতিমালা ও নিয়মিত বাজার তদারকি না থাকলে এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ভবিষ্যতেও চলতেই থাকবে।’

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো দ্রুত হস্তক্ষেপ, বাজার তদারকি জোরদার এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

এলপিজি এখন দেশের লাখো পরিবারের একমাত্র রান্নার জ্বালানি। সেই জ্বালানির দাম যদি এভাবে হঠাৎ করে বেড়ে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।

এলপিজি খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি বিক্রি হয়ে থাকে। কিন্তু গত ডিসেম্বরে তা নেমে আসে প্রায় ৮৫ হাজার টনে। চাহিদা কমে যাওয়ায় নয়, বরং সরবরাহ ঘাটতির কারণেই অন্তত ৩০ হাজার টনের বেশি এলপিজির সংকট তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন ব্যবসায়ীরা।

অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের নভেম্বরে এলপিজি পরিবহনকারী জাহাজ, এ খাতের কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র বড় পরিসরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর পর থেকেই এসব প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ এশিয়ায় এলপিজি সরবরাহ করতে পারছে না। ডিসেম্বর থেকে আমদানিতে সংকট শুরু হলেও চলতি মাসে এর সরাসরি প্রভাব বাজারে দেখা যাচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, শীতকালে স্বাভাবিকভাবে এলপিজির চাহিদা বাড়ে। কিন্তু সেই তুলনায় বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। চাহিদা ও জোগানের এই অসামঞ্জস্যের সুযোগ নিয়ে খুচরা পর্যায়ে দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

রেস্তোরাঁর মালিক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, আমার হোটেলে দৈনিক তিনটা সিলিন্ডারের প্রয়োজন হয়। বৃহস্পতিবার দাম ছিল ১ হাজার ৫০০ টাকা, শুক্রবার ১ হাজার ৭০০ টাকা দাম নিল। আমরা অনেকগুলো কিনি বলে দাম কিছুটা কম পাচ্ছি। খুচরা বা বাসাবাড়ির সিলিন্ডার ২ হাজার টাকার ওপরে কিনতে হচ্ছে।

চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুচরা বাজারে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাসের সিলিন্ডার পাচ্ছেন না বিক্রেতারাও। তাই আবাসিক থেকে চায়ের দোকান—কোথাও প্রয়োজনীয় সরবরাহ দিতে পারছেন না বলে জানান।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) শীর্ষ নেতারা অবশ্য জানান, শীত মৌসুমে এলপিজির চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বেশি থাকে। তার ওপর কয়েকটি কোম্পানির আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট আরো তীব্র হয়েছে। দ্রুত আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

এলপিজির বিদেশী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জাহাজের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় দেশের বাজারে এর প্রভাব পড়েছে কিনা—এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় লোয়াবের সভাপতি ও ডেল্টা এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হকের কাছে।

তিনি বলেন, ‘মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশে এলপিজি সংকট দেখা দিয়েছে, বিষয়টি ঠিক নয়। এখন শীত মৌসুম, এ সময় এলপিজির একটু ঘাটতি থাকেই। তবে ঘাটতির আরো কারণ হলো দেশে বেক্সিমকো, বসুন্ধরাসহ বড় পাঁচটি কোম্পানি এখন এলপিজি আমদানি করছে না। তাদের অবর্তমানে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করতে হলে অন্য কোম্পানিগুলোকে আমদানি করতে হবে। কিন্তু সেটি তো হচ্ছে না। এ সংকট কাটাতে আমরাসহ (ডেল্টা এলপি গ্যাস) পাঁচটি কোম্পানি এলপিজি আমদানি বাড়াতে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিলাম, কিন্তু কাউকে অনুমতি দেয়া হয়নি।’

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ গত ২০ নভেম্বর ৪৮ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সে তালিকায় রয়েছে সিঙ্গাপুর, ইরান ও ভারতের ১৪ ব্যবসায়ী, ২৪টি প্রতিষ্ঠান এবং ১০টি এলপিজি ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বহনকারী জাহাজ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বড় অংশই ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক এবং তারা দক্ষিণ এশিয়ায় এলপিজি ও জ্বালানি তেল সরবরাহের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। নিষেধাজ্ঞার ফলে এসব ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর বাজারে।

এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরাসরি ইরান থেকে এলপিজি আমদানি না করলেও দেশটির উৎপাদিত গ্যাস বিভিন্ন বিদেশী ট্রেডারের মাধ্যমে, নথিপত্র ও রুট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আসত। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ঝুঁকি ও আর্থিক ক্ষতির শঙ্কায় এখন অপারেটররা সে উৎস এড়িয়ে চলছেন। ফলে দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ চ্যানেল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

এলপিজি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইরান থেকে এলপিজির বৈশ্বিক সরবরাহকারীরা এখন মারাত্মক সংকটে পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে ওই বাজার থেকে নিজেদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। ফলে বিকল্প উৎস না পাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, দেশের বাজারে সরবরাহকৃত এলপিজির প্রায় ৫০ হাজার টন আমদানি হয় ভারতের ওড়িশার ধামরা বন্দর দিয়ে। আরো প্রায় ২০ হাজার টন আসে যৌথ বিনিয়োগে বাংলাদেশে পরিচালিত একটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। বাকি প্রায় ৫০ হাজার টন বিভিন্ন মধ্যবর্তী উৎস হয়ে ইরানসহ অন্যান্য দেশ থেকে আসত। নিষেধাজ্ঞার কারণে বড় এ অংশের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

দেশের এলপিজি চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করে থাকে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। এলপিজি আমদানি ও বিপণনের জন্য বর্তমানে ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স থাকলেও বাজারে আছে ২৮টির মতো কোম্পানি।

সরকার এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘এর মূল কারণ এলসি জটিলতা। বেশ কিছু কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউশন বর্তমানে প্রায় বন্ধ রয়েছে। আর যাদের সরবরাহ চালু আছে, তারাও চাহিদার তুলনায় অনেক কম গ্যাস দিচ্ছে। সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে কোম্পানিগুলো এলসি জটিলতার কথা বলছে। সময়মতো এলসি খুলতে না পারায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এলপিজি আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না বলে তারা জানিয়েছে আমাদের। আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব শিগগির।’

ফখ/তাসু/চখ

এই বিভাগের আরও খবর