টেকনাফে জলবায়ু পরিবর্তন ও রোহিঙ্গা সংকটে বহুমাত্রিক বিপর্যয়ের শঙ্কা
জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর মধ্যে কক্সবাজারের টেকনাফ ও সেন্টমার্টিন দ্বীপ ঝুঁকির মুখে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার এবং মানবসৃষ্ট চাপ এ অঞ্চলের পরিবেশ ও জনজীবন ক্রমেই বিপর্যস্ত করে তুলছে।
১৯৯১ সালে সেন্টমার্টিন দ্বীপের আয়তন ১৩.৩৭ বর্গকিলোমিটার
বর্তমানে আয়তন কমে প্রায় ১১ বর্গকিলোমিটার
তথ্যানুসারে জানা যায়, ১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পর সেন্টমার্টিন দ্বীপের আয়তন ছিল ১৩ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার।তবে দীর্ঘদিনের উপকূলভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে বর্তমানে দ্বীপটির আয়তন কমে প্রায় ১১ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে।একসময় নারকেল, কেয়া, ঝাউসহ নানা প্রজাতির গাছপালায় ভরপুর দ্বীপটি এখন অনেকটাই উন্মুক্ত ও অনাবৃত।ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ত পানির আঘাতে অধিকাংশ উদ্ভিদ ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে দ্বীপের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্বীপের মানুষের প্রধান জীবিকা ছিল মাছ ধরা ও কৃষিকাজ।কিন্তু লবণাক্ত পানি প্রবেশ ও পর্যটকদের জন্য নির্মিত ভবণের কারণে, কৃষিকাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।সরকার বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনার কথা বললেও বাস্তবে তার সুফল খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না।পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে,পর্যটকদের জন্য বছরে মাত্র দুই মাস রাত্রীযাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।বাকি সময় পুরো দ্বীপ কার্যত ‘লকডাউন’ অবস্থায় থাকে।যা স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
২০১১ সালে বেড়িবাঁধ নির্মাণ বাস্তবায়ন হয়নি
২০১২ সালের বন্যায় সমুদ্রে তলিয়ে যায় ৩টি গ্রাম
এদিকে, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে উপকূল রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার ফলেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে।২০১১ সালে বেড়িবাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় ২০১২ সালের বন্যায় এলাকার তিনটি গ্রাম পুরোপুরি বঙ্গোপসাগরে বিলীন হয়ে যায়।এসব গ্রামের বাসিন্দারা এখন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করছে, অনেকেই চরম মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান, আগামী বছর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আরও প্রায় তিন ফুট বাড়তে পারে। দুর্যোগ ও আবহাওয়া বিভাগ ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে। এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান বেড়িবাঁধ ও উপকূলরক্ষা ব্যবস্থার ঝুঁকি নিয়ে সরকারের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে, টেকনাফ অঞ্চলের ওপর আরেকটি বড় চাপ তৈরি হয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের কারণে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী। এর একটি বড় অংশ টেকনাফের ঝুঁকিপূর্ণ বনভূমি ও পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করছে। এতে বন উজাড়, পাহাড় ধ্বসের ঝুঁকি বৃদ্ধি, বন্যপ্রাণীর আবাস ধ্বংস ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও অতিরিক্ত জনচাপ এ অঞ্চলের পরিবেশ এবং স্থানীয় জনজীবনকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দ্রুত টেকসই উপকূলরক্ষা ব্যবস্থা, বন পুনর্বাসন, পরিকল্পিত পর্যটন ও বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা না হলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
টেকনাফ সদর উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা জহির আহমেদ বলেন, ঝাউগাছ থাকলে জোয়ারের পানি সহজে উপকূলে ঢুকতে পারে না। কিন্তু কিছু অসাধু চক্র রাতের আঁধারে ঝাউগাছ কেটে নিচ্ছে। এসব বাগান রক্ষায় কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
টেকনাফ সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সন্তোষ কুমার শীল বলেন, বাংলাদেশ প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো ও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর শিল্পকারখানার ধোঁয়া ও কার্বন নিঃসরণের প্রভাব আমাদের দেশে পড়ে। এর ফলে মিথেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে। দেশে জনসংখ্যা বেশি কিন্তু পর্যাপ্ত বনভূমি নেই, পশুপাখির সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। নদীভাঙনের ফলে বাড়ছে বন্যার ঝুঁকি।
কক্সবাজারের পরিবেশ ও জলবায়ু কর্মী জিমরান মো. সায়েক বলেন, জলবায়ু ও ভূ-প্রকৃতির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে টেকনাফ একটি অনন্য পরিবেশ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এখানকার মানুষকে আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক বিপদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এর ফলে তাদের জীবিকা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এসব এলাকায় দুর্যোগ সহনশীল বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে।
টেকনাফ উপকূলীয় বন বিভাগের কর্মকর্তা বশির আহমেদ বলেন, উপকূল রক্ষায় ঝাউবাগান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝাউবাগান উপকূলবাসীকে সুরক্ষা দিয়েছে। বেড়িবাঁধ রক্ষায় ঝাউগাছের পাশাপাশি অন্যান্য উপযোগী গাছ রোপণের বিষয়েও কাজ চলছে। মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন উপকূল রক্ষায় ইতোমধ্যে ১০০ টন বনায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এসব কাজে সরকারি বাজেট বরাদ্দ রয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষিকাজে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে। টেকনাফের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকার সংগ্রামে অভ্যস্ত। তবে এখনই শক্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ, মাটি ধরে রাখতে বৃক্ষরোপণ এবং লবণসহিষ্ণু ফসলের উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মানচিত্রে টেকনাফ অঞ্চল রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
চখ/ককন
