খেজুর রসে নিপাহ ভাইরাসের প্রাণঘাতী ঝুঁকি
শীতের শুরুতেই গ্রাম-বাংলার ঘরে ঘরে খেজুর রস সংগ্রহের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। ফিরে আসে এক চেনা দৃশ্য। কুয়াশাভেজা ভোরে খেজুর গাছের মাথায় ঝুলে থাকা হাঁড়ি, ভোরের আলো ফোটার আগেই নামানো রস, আর সেই কাঁচা রস ঘিরে মানুষের আলাদা এক আগ্রহ। অনেক মানুষের কাছে কাঁচা খেজুরের রস কেবল একটি পানীয় নয়- এটি শীতের ঐতিহ্য, শৈশবের স্মৃতি আর গ্রাম-বাংলার সংস্কৃতির অংশ।
খেজুর রসে তৈরি হয় নানান পদের পিঠা-পায়েস। কিন্তু এই মিষ্টি ঐতিহ্যের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। অসচেতন হলে এই রসই হয়ে উঠতে পারে মৃত্যুর কারণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসচেতনভাবে সংগৃহীত কাঁচা খেজুর রস প্রাণঘাতী ভাইরাস সংক্রমণের কারণ হতে পারে। শীত এলেই দেশে নিপাহ ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভাইরাসের সঙ্গে কাঁচা খেজুরের রসের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। বাদুড় এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক। রস ভোরে সংগ্রহ করে কাঁচা অবস্থায় পান করলেই মানুষের শরীরে ভাইরাস প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হয়। এখান থেকেই শুরু হয় মারাত্মক অসুস্থতা, যার পরিণতি অনেক সময় মৃত্যু।
প্রতি বছর শীত মৌসুমে গাছিরা খেজুর গাছে মাটির হাঁড়ি বা কলস পেতে রস সংগ্রহ করেন। তবে এসব হাঁড়ির খোলা মুখে শুধু খেজুর রসই জমা হয় না, রাতের আঁধারে খাদ্যের সন্ধানে আসা বাদুড় ও বিভিন্ন পাখিরও অবাধ বিচরণ ঘটে সেখানে।
ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের রাতে নিশাচর বাদুড় খেজুর গাছের হাঁড়িতে বসে রস পান করে। এ সময় তারা হাঁড়ির কিনারে ঝুলে থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে রসের ভেতরেই মল-মূত্র ত্যাগ করে। ফলে রস দূষিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
পটিয়ার পূর্ব হাইদগাঁওয়ের গাছি জয়নাল আবেদীন জানান, কুয়াশার কারণে রাতভর হাঁড়ি পাহারা দেওয়া সম্ভব হয় না। রাতের বেলা বাদুড় তাড়ানোর চেষ্টা করি। কিন্তু কুয়াশায় সব সময় নজরে রাখা যায় না। সকালে রস নামাতে গিয়ে অনেক হাঁড়িতে বাদুড়ের লালা বা নোংরা দেখতে পাই বলেও জানান তিনি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জন ডা. মু. ইসমাইল হোসেন সুমন বলেন, বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ানো ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে তা মারাত্মক রোগের কারণ হতে পারে, অনেক সময় প্রাণঘাতীও হয়ে ওঠে। বিশেষ করে কাঁচা বা অপরিশোধিত খেজুর রস সরাসরি পান করলে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। খেজুর রস বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এর নিরাপদ সংগ্রহ ও ভোগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। খেজুর রস সংগ্রহের সময় হাঁড়ির মুখ ঢেকে রাখা, কাঁচা রস না খাওয়া এবং রস ভালোভাবে ফুটিয়ে নেওয়ার পর ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সামান্য সচেতনতা ও সতর্কতাই পারে এই নীরব কিন্তু ভয়ংকর ঝুঁকি থেকে মানুষকে রক্ষা করতে।
