chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

ছবি: এম ফয়সাল এলাহী

জাল-জলেই তাদের জীবন

‘আঁরা চাঁটগাইয়া নওজোয়ান/দইজ্জার কুলত বসত গরি আরা/ সিনাদি ঠেগাই জড়-তোঁয়ান’।

উল্লিখিত গানের কথার মতো প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করেই সমুদ্রে ঠিকে থাকতে হয় জেলেদের। সমুদ্রে মাছ ধরাই এসব জেলেদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বিরুপ আওহাওয়ার মাঝেও সমুদ্রে যেতে হয়। সমুদ্রে প্রতি মুহূর্তে জীবনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিতে হয়। কপাল ভালো হলে ছেলে সন্তানে মুখ দেখার সুযোগ হয়। কখনো সাগর জলেই হয় তাদের সলিল সমাধি। সবকিছুর পরও সমুদ্রই তাদের একমাত্র অবলম্বন। গভীর সমুদ্রের নীল জলরাশিই তাদের প্রতিদিনে সঙ্গী।

পতেঙ্গা জেলে পাড়ার সাধন চন্দ্র  দাস। ৩০-৩৫ বছর ধরে মাছ ধরার সাথে জড়িত। ১৯৯০ সালে এসএসসি দেওয়ার পর আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেনি। অবশেষে বাপ-দাদার পেশা টিকিয়ে রাখতে সমুদ্রে পথচলা। সেই যে শুরু আর থামার ফুরসত নেই। বর্তমানে তিন সন্তানের জনক জেলে সাধন চন্দ্র। সন্তানরা সবাই লেখাপড়া করছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তিনি নিজে লেখাপড়া করতে পারেন কিন্তু সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য কষ্ট করে যাচ্ছেন তিনি। যে জেলে পাড়ায় এক সময় শিক্ষিত মানুষ পাওয়া দুষ্কর ছিল। সেখানের ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে দল বেঁধে।

এই পেশার বিভিন্ন সম্ভাবনা ও হুমকি নিয়ে সাধন চন্দ্র বলেন, বর্তমানে সমুদ্রে মাছ ভালা পড়তেছে। তবে সেখান থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে তাদের সারা বছরের ক্ষতি পুষিয়ে উঠা সম্ভব নয় বলে জানান। তাদের যা লাভ হয় তার সিংহভাগই চলে যায় দাদন ব্যবসায়ীদের হাতে। এসব দাদন ব্যবসায়ীরা আগাম টাকা দেয় জেলেদের। এই টাকা শোধ করার পাশাপাশি সমুদ্রে পাওয়া মাছও তাদের কাছে বিক্রি করতে হয়। ফলে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয় এসব জেলেরা।

তিনি বলেন, সরকারিভাবে বছরের বিভিন্ন সময়ে মাছ ধরা বন্ধ থাকে। এসময় সরকার থেকে জেলেদের জন্য অনুদান আসে। কিন্তু হাত বদল হতে হতে জেলেদের কাছে পৌছায় সামান্য অংশ। ফলে মাছ ধরা বন্ধ হলে তাদের জীবনযাপন হয়ে পড়ে দুর্বিষহ। মাসিক সংসার খরচ আছে ৩০ হাজার টাকার মতো কিন্তু আমাদের আয় হয় মাসে ২০ হাজার । তিনজন ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার চালিয়ে যেতে হিমশিম খেতে হয় বলে জানান তিনি।

দীর্ঘদিন ধরে মাছ ধরার সাথে জড়িত নোয়াখালীর সরোয়ার মাঝি। অভিজ্ঞতা গুনে পানির রঙ দেখে বলে দিতে পারেন কোন পানিতে কেমন মাছ পড়বে।তিনি বলেন যদি পানি রঙ সাদা হয় সেখানে মাছ পড়ার তেমন সম্ভাবনা নেই। লাল রঙের পানিতে পড়বে ইলিশের ঝাঁক। যদি পানির রঙ কালো হয় তাহলে তো কথাই নেই জালে পড়বে বিভিন্ন ধরণের মাছ। এভাবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলে যাচ্ছিলেন তিনি।

আগামীতে তাদের পেশা টিকে থাকার ব্যাপারে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সরকার এখানে বে-টার্মিনাল করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। যদি বে-টার্মিনাল নির্মান করা  হয় তাহলে আমাদের এই পেশা হারিয়ে যাবে। কারন আমাদের সমুদ্রে নামার কোনো সুযোগ থাকবে না। ফলে হুমকির মুখে পড়বে প্রায় দু’হাজার জেলে পরিবারের জীবন-জীবিকা।

এই বিভাগের আরও খবর