chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

চট্টগ্রামের ঐতিহ্য হয়ে টিকে আছে গণি বেকারির বেলা বিস্কুট

বিস্কুট তৈরিতে মাটির তন্দুর এখন বিলুপ্তপ্রায়। সে জায়গা দখল করে নিয়েছে বৈদ্যুতিক ওভেন। আবার ইস্ট ছাড়া বিস্কুট তৈরির কথা ভাবাই যায় না। এসব আধুনিক যন্ত্র আর উপাদান দূরে ঠেলে প্রাচীন পদ্ধতিতে বেলা বিস্কুট তৈরি করে যাচ্ছে গণি বেকারি

চট্টগ্রামের মানুষের সাথে বেলা বিস্কুটের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।কিন্তু এই বেলা বিস্কুট তৈরির যাত্রা শুরু হয় গণি বেকারি প্রতিষ্ঠা হবার আরও আগে। প্রায় ২০০ বছর আগে তৈরি হওয়া এই বিস্কুটকে বলা হয়ে থাকে উপমহাদশের অন্যতম প্রাচীন বিস্কুট।

বছরের পর বছর চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের মধ্যে প্রসার লাভ করা এই বিস্কুট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে দেশের অন্যান্য স্থানেও। গবেষকদের তথ্যানুসারে, আবদুল গণি সওদাগরের পূর্বপুরুষ লাল খাঁ সুবেদার ও তাঁর ছেলে কানু খাঁ মিস্ত্রির হাত ধরে বেকারি পণ্য তৈরির সূচনা হয় চট্টগ্রামে। সে সময়ে এই এলাকায় প্রবেশ ঘটে পর্তুগিজদের। তাদের খাদ্যাভ্যাসে ছিল রুটি, পাউরুটি, বিস্কুটসহ নানা বেকারি পণ্য। প্রচলিত রয়েছে পর্তুগিজদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই আবদুল গণি সওদাগর প্রথম বেলা বিস্কুটের প্রচলন ঘটিয়েছিলেন। তাদের এমন খাদ্যাভ্যাসের কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে পুরোদমে শুরু হয় বেকারি শিল্পের যাত্রা।

চট্টগ্রামের চন্দনপুরা এলাকায় এই বেকারির অবস্থান। বেকারির নাম অনুসারে এই এলাকায় একটি গলিও আছে। নাম ‘গণি বেকারি গলি’। চট্টগ্রামে বসবাসরত প্রায় সব মানুষেরই এই বেকারি নিয়ে আছে ভালো জানাশোনা।

এই বেকারির পণ্যের ইতিহাস শুরু হয়েছিলো গণির পূর্বপুরুষ লাল খাঁ সুবেদার এবং তার ছেলে কানু খাঁ মিস্ত্রির হাত ধরে। ঠিক কখন গণি বেকারিতে বেলা বিস্কুট তৈরি হতে শুরু করে, তার সঠিক তথ্য নেই। তবে মোগল আমলের শেষদিকে ও ইংরেজ আমলের শুরুতে ভারতের বর্ধমান থেকে আগত লাল খাঁ ও কানু খাঁ এই বেকারিশিল্পের সূচনা করেন চট্টগ্রামে।

চার পুরুষের প্রজন্ম ধরে চলছে এই বেকারির কাজ

কিন্তু তখনো গণি বেকারির এত নামডাক ছিলো না। ১৮৯০ সালের দিকে এই যাত্রায় নাম লেখান আবদুল গণি সওদাগর। নিষ্ঠার সাথে দীর্ঘদিন পরিচালনা করেছেন এই বেকারির কার্যক্রম। ১৯৭০ সালে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর বেকারির দায়িত্ব নেন আবদুল গণির ভাইয়ের ছেলে দানু মিয়া সওদাগর। তার মৃত্যুর পরে জামাল উদ্দিন এবং পরবর্তীতে তার পুত্র আবদুল্লাহ মোহাম্মদ এহতেশামের উপর অর্পিত হয় এই গুরুভার।বর্তমানে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ এহতেশামই বেকারির ব্যবসাটি দেখাশোনা করছেন।

মানুষের শৈশব-কৈশোরের অনেক গল্প এবং স্মৃতির সাথে সম্পৃক্ত এই বেকারি ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। যুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ সৈন্যদের জন্য খাবার হিসেবে রুটি নিয়ে আসা হতো এই ‘গণি বেকারি’ থেকেই। প্রতিদিন বিশাল সংখ্যক সৈন্যের জন্য রুটি তৈরি করতে হতো গণিকে। এত মানুষের জন্য যেসব কাঁচামাল দরকার হতো সেটি তখন ব্রিটিশরাই সরবরাহ করতো তাকে। সে সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত গণি বেকারি ক্রেতাদের কাছে এক আস্থার নাম।

অতি প্রাচীন এই বেকারির নেই দ্বিতীয় কোনো শাখা। কেবল চট্টগ্রামের চন্দনপুরা এলাকায় কলেজ গলিতে ১৫৫ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত একমাত্র শাখার দেখা মেলে।

ঐতিহ্যবাহী এই বেকারি এখনো প্রাচীন পদ্ধতিতেই ভর করে টিকে আছে। ১৫৫ বছর আগে যে চুলা ব্যবহার করে বিস্কুট তৈরি করা হতো এখনো সেই চুলাতেই তৈরি হয় বেকারির পণ্য।

আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে একাধিক মেশিনের চল এলেও প্রকৃত স্বাদ ও পণ্যের যথাযথ মান বজায় রাখতে এখনো বেকারির বিস্কুট তৈরি করা হয় ‘তন্দুরে’। মাটির তৈরি চুলাকে বলা হয় ‘তন্দুর’। বিস্কুট তৈরির পুরো পদ্ধতিজুড়ে যত পন্থা অবলম্বন করা হয় তার সবকিছুতেই আছে সেই প্রাচীন সময়কার ছাপ। ১৫ জন কর্মী অতি দক্ষতার সাথে করে যাচ্ছেন এই কাজ।

তবে এইজন্য বেশ দুর্ভোগও পোহাতে হয় বেকারিকে। ১৮৭০ সালে বিস্কুট তৈরি করতে মাটির যে তন্দুরি চুলা ব্যবহার করা হতো সেটি বেশ পুরাতন হওয়ায় বারবার মাটির প্রলেপ লাগিয়ে ঠিক করতে হয় যা বেশ কষ্টসাধ্য একটা কাজ। মেশিন ব্যবহার করলে হয়তো তাদের এত কষ্ট হতো না। তবে মেশিনে পণ্যের স্বাদে ভিন্নতা তৈরি হয় বলেই এখনো মাটির তন্দুরেই ভরসা করেন তারা।

শুধু তাই নয়, বিস্কুট তৈরিতেও তাদের আছে নিজস্ব পদ্ধতি৷ যার ফলে অন্যান্য সব বেকারির চেয়ে এই বেকারির পণ্য একেবারেই আলাদা। সাধারণত বিস্কুট তৈরিতে ইস্ট ব্যবহৃত হলেও এখানে সেটা করা হয় না। ইস্টের পরিবর্তে ‘মাওয়া’ নামের একটি মিশ্রণ ব্যবহার করা হয় যা তাদের গোপন তরিকা হিসেবেও সমাদৃত। এই কারণে বিস্কুটের স্বাদেও তৈরি হয় ভিন্নতা।

শীতল হাওয়ার ভোরবেলাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে বেলা বিস্কুট ডুবিয়ে খাওয়া যেন এখানকার সব মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করে অন্যরকম প্রশান্তি। বর্তমানে বেলার সাথে যুক্ত হয়েছে মাখন বেলাও।

এই বেকারির অন্দরে বিস্কুট কেনার উদ্দেশ্যে আগমন ঘটে বিভিন্ন বয়েসি ক্রেতার। তাদের ৩০ ধরণের পণ্যের মধ্যে ক্রেতাদের পছন্দের শীর্ষে আছে বেলা বিস্কুট। প্রায় ৩ ধরণের বেলা পাওয়া যায় এখানে। বেলা, মাখন বেলা এবং রোজ বেলা। এদের মধ্যে মাখন বেলার দাম সরচেয়ে বেশি। ৩০ পিস মাখন বেলার দাম রাখা হয় ১৫০ টাকা, সাধারণ বেলা এবং রোজ বেলার দাম ১১০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। দিনে ২০০-২৫০ প্যাকেট বিস্কুট বিক্রি হয় তাদের।

ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী বেলা বিস্কুটের যোগান দিতে পারেন না তারা অনেক সময়। কারণ বেকারির কেবল একটা শাখা। এছাড়া বেলা বিস্কুট পুরোপুরি তৈরি করতে সময় লাগে ২ দিন। সময়সাপেক্ষ হওয়ার কারণেও যোগান বেশি দেওয়া সম্ভব হয় না।

এই বেকারির আরও একটি উল্লেখযোগ্য পণ্য হলো বাকরখানি। সাধারণ বাকরখানির মত নয় এটি। স্বাদে অনন্য এই বাকরখানি খাওয়া হয় মাংসের ঝোল বা মাংস দিয়ে। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোর মধ্যে এটিও একটি। কোরবানির ঈদে গরু বা খাসির মাংসের লাল ভুনা কিংবা কালা ভুনার সাথে বাকরখানি দিয়ে মেহমান আপ্যায়ন করা হয় প্রায় প্রতিটি ঘরে। এমনকি ঈদের আগে এই বাকরখানির জন্য পূর্বেই অর্ডার দিয়ে রাখতে হয়। দুই ধরণের বাকরখানি আছে এই বেকারিতে। একটি শুকনো বাকরখানি, অন্যটি চিনির শিরাযুক্ত রসালো বাকরখানি। মাংসের সাথে এই বাকরখানির সংমিশ্রণ স্বাদে নিয়ে আসে অন্যরকম বৈচিত্র্য।

বৈচিত্র্যময় এই বাকরখানির দেখা মেলে কেবল চট্টগ্রামে। বাকরখানির কথা আসলেই সবার চোখের সামনে ভেসে উঠে পুরান ঢাকার মুচমুচে নোনতা বাকরখানির কথা। কিন্তু গণির বাকরখানি খেতে এমন শুকনো বা নোনতা স্বাদের হয় না। অত্যন্ত রসালো এবং সুমিষ্ট চট্টগ্রাম অঞ্চলের এই বাকরখানি ছেলেবুড়ো সবারই অন্যতম পছন্দের খাবার।

শতাব্দী প্রাচীন এই বেকারির সঙ্গে ক্রেতাদের রয়েছে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। অতীতে যেসব ক্রেতাদের মন জয় করে নিয়েছিলো এই বেকারির পণ্য, সেসব ক্রেতারা এখনো এসে ভিড় করেন এখানে৷ ক্রেতাদের এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন বংশপরম্পরায় পরবর্তী প্রজন্মের ক্রেতারাও।

মাত্র ১৫ জন কর্মী নিয়ে চলা গণি বেকারীর আর কোনো শাখা খোলেননি এহতেশাম। কারণ, বেকারীর আদি ও আসল স্বাদ, মান এবং ঐতিহ্য ধরে রাখা। আর গণি বেকারি সেটি করতে পেরেছে খুব সফলভাবেই।

“ষাটের দশকের এক সন্ধ্যার কথা। আব্বা অফিস থেকে বাসায় ফিরলেন অনেকগুলো বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে। প্যাকেটগুলো হাতে পেয়েই আমরা ভাই-বোন সবাই মিলে এমন আনন্দে মেতে উঠলাম, বাইরে থেকে দেখে যে কেউ ধারণা করে নেবে হয়তো খুব বড় কোনো উপহার পেয়ে গেছি। প্যাকেটগুলো নিয়ে আমাদের ভাইবোনের মধ্যে হতো কাড়াকাড়ি। আব্বাও আমাদের আনন্দ দেখে হাসেন। এরপর থেকে প্রায়ই তিনি সেই বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে বাসায় ফিরতেন। আমরা সকাল-সন্ধ্যায় সেই বিস্কুট চায়ে ডুবিয়ে খেতে খেতে আড্ডা দিতাম। গণি বেকারির সাথে আমাদের পরিচয় হয় এভাবে। আব্বা বেঁচে নেই অনেক বছর হলো। কিন্তু তার নিয়ে আসা সেই বিস্কুটের প্রতি রেশ রয়ে গেছে এখনও। তাই যখনই চট্টগ্রাম যাই, কয়েক প্যাকেট বিস্কুট নিয়ে আসি এই বেকারি থেকে”, গণির বিস্কুট নিয়ে এভাবেই স্মৃতিচারণ করছিলেন তুহিনা হক। মুখে তার স্মিত হাসি। হয়তো সেই সময়টার আরও অনেক স্মৃতি মাথায় এসে জড়ো হচ্ছে একে একে।

গণি বেকারি নিয়ে ২৫ বছর বয়সী  আতাউর রহমান অনিক তার জমানো স্মৃতি নিয়ে কথা বলছিলেন ।তিনি বলেন- “আমরা সাতকানিয়ায় থাকতাম আর আব্বু টেরিবাজারে চাকরি করতেন। প্রতি শুক্রবার বাড়ি আসার সময় তিনি গণি বেকারি থেকে বেলা বিস্কুট নিয়ে আসতেন। এক প্যাকেটে ৫০ পিস বিস্কুট থাকতো তখন। কাগজের প্যাকেটেই বিক্রি হতো সব পণ্য। আব্বুর নিয়ে আসা সেই বিস্কুট সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন দাদী এবং ফুফু। কিন্তু দাদী মারা যাওয়ার পর আব্বু এই বিস্কুট তেমন একটা নিয়ে আসেন না আর।”

শতাব্দী প্রাচীন এই বেকারির সাথে ক্রেতাদের রয়েছে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। শুরুর দিকে যেসব ক্রেতাদের মন জয় করে নিয়েছিলো এই বেকারির পণ্য, সেসব ক্রেতারাই এখনো এসে ভিড় করেন এখানে৷ ক্রেতাদের এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে বংশপরম্পরায় সম্পৃক্ত ক্রেতাও। এমনই একজন ক্রেতা হলেন তানিয়া আক্তার। তার বাবা এই বেকারি থেকে পণ্য নিয়ে আসতেন নিয়মিত। এরই ধারাবাহিকতায় তিনিও নিয়ম করে এখান থেকেই পণ্য কিনে নিয়ে যান।

তিনি বলেন, “বাবার সময় থেকেই এই বেকারিকে চিনি আমরা। তখন থেকেই একটা বিশ্বাস তৈরি হয়েছে এই বেকারির প্রতি। অবশ্য তারা সে বিশ্বাসটা অর্জনও করতে পেরেছে। তাই প্রতিবার এখান থেকেই পাউরুটি, টোস্ট, চানাচুর এইসব কিনে নিই।”

এই বিষয়ে এহতেশাম বলেন, “যারা আগে থেকে  আমাদের ক্রেতা ছিলো তারাই বারবার কেনে। দেখা যায় তাদের দেখাদেখিতে তাদের ছেলেমেয়ে এই বেকারি থেকে কেনার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে।”

চট্টগ্রামের কাঠগড়ে বসবাসরত এক ক্রেতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এই ক্রেতা দুই প্যাকেট বিস্কুট ২২০ টাকা দিয়ে কিনতে গাড়ি ভাড়া খরচ করেন ৫০০ টাকারও বেশি। প্রতিবার এই দূরত্ব অতিক্রম করে তিনি গণি থেকেই  বিস্কুট কিনে নেন ছেলেমেয়েদের জন্য।

এহতেশাম বলেন, “এই ক্রেতাদের জন্যই গণি এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তারা আমাদের উপর বিশ্বাস রেখেছে আর আমরা চেষ্টা করে যাই সে বিশ্বাসের জায়গা যাতে নষ্ট না হয়।”

লাভ-লোকসানের হিসেব নয়, কেবল বেকারির ঐতিহ্য এবং বেকারির সাথে সম্পৃক্ত বংশপরিচিতি ধরে রাখতে এখনো পণ্য তৈরি করার কাজ অব্যাহত রেখেছেন তারা। একটাই লক্ষ্য তাদের সামনে, তা হলো যে সুনাম তৈরি করে গেছেন গণি সওদাগর সেটি টিকিয়ে রাখা। এই কারণে পূর্বপুরুষরা পণ্যের মানের যে মানদণ্ড বা ঐতিহ্য সৃষ্টি করে গেছেন সেটায় বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ বর্তমান কর্ণধার এহতেশাম।

তিনি বলেন, “আমার দাদা-বাবার যত্নে করা যে বেকারি বিশাল সংখ্যক মানুষের আস্থার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে তার পণ্যের মানের সাথে কম্প্রোমাইজ করা মানে হলো নিজের সাথেই অন্যায় করা।”

 

 

এই বিভাগের আরও খবর