chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

বাংলার শেষ প্রান্তের এক মায়াময় কবিতা টেকনাফ: দেশবাসীর রোষানলে

বাংলাদেশের ভূখন্ডে সর্বদক্ষিণে অবস্থিত উপজেলা টেকনাফ। যেখানে পাহাড় নেমে গেছে সাগরের কোলে। এ জনপদ প্রকৃতির নির্মল সৌন্দর্যের এক জীবন্ত প্রতীক। এখানে নীল জল, সবুজ পাহাড় আর লবণাক্ত হাওয়ার স্পর্শে প্রতিদিনই জন্ম নেয় এক নতুন কবিতা। যার প্রতিটি পরশে লুকিয়ে আছে মাথিন-ধীরাজের অমর প্রেমের ইতিহাস ও ভালোবাসার রহস্য। নাফ নদীর তীর ঘেঁষে বিস্তৃত এই জনপদে সকাল শুরু হয় সূর্যের সোনালি আলোয় আর সন্ধ্যা নামে মায়াবী নীলচে ছায়ায়। দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সাদা বালির মোহনীয় সৌন্দর্যে ঘেরা এক স্বপ্নলোক সেন্টমার্টিন। ঢেউয়ের স্বচ্ছ পানি, নারিকেল বাগান, প্রবালের নকশায় সাজানো তটরেখা ও নির্জন সন্ধ্যার আকাশ এখানে ভ্রমণকারীদের মুগ্ধ করে রাখে। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ সেন্টমার্টিনকে করে তোলে সৌন্দর্যের অনন্য আশ্রয়স্থল। শাহপরীর দ্বীপের বালুকাবেলায় যখন ঢেউ এসে পায়ের কাছে গোপন কথা বলে যায়, তখন মনে হয় এ যেন সাগর আর মানুষের অন্তহীন সংলাপ। পাহাড়ঘেরা গ্রামগুলোয় এখনো শোনা যায় পাখির ডানার শব্দ, দেখা মেলে ধানখেতের উপরে ভেসে বেড়ানো রঙিন প্রজাপতির। হোয়াইক্যং, হ্নীলা ও বাহারছড়া প্রতিটি নামই যেন কোনো প্রাচীন কবির লেখা একেকটি পঙক্তি। টেকনাফ শুধু পর্যটনের স্থান নয়, এটি এক অনুভবের নাম। এখানে এসে কেউ হারিয়ে ফেলে শহুরে ব্যস্ততা কেউ খুঁজে পায় নিজের নিঃশব্দ আত্মাকে। পাহাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে যখন দিগন্ত ছোঁয়া সমুদ্র দেখা যায়, তখন বাংলাদেশের সৌন্দর্যকে যদি একটি ছবিতে আঁকা যায়, তবে তার নাম হবে ‘টেকনাফ’। কিন্তু এ সৌন্দর্যের বুকে কলঙ্ক লাগিয়েছে একঝাঁক ইয়াবা চোরাকারবারি, অপহরণকারী ও মানবপাচারকারীরা। অরক্ষিত সীমান্তকে কাজে লাগিয়ে অর্থলোভীরা এ জনপদকে দেশবাসীর কাছে মাদকের স্বর্গরাজ্য বানিয়েছে। এ জনপদ মাদকের জন্য দেশব্যাপী আলোচিত হলেও স্থানীয় অধিকাংশ সাধারণ মানুষ কেটে খাওয়া। বাংলার মাঠিতে এ জনপদের মানুষের শিকড়। সীমান্তের নাফের জল, নেটং পাহাড় ও সমুদ্র বেষ্টিত জনপদে তাদের বেড়ে ওঠা।

এদিকে তথ্যানুসারে জানা যায়, নাফ নদীকে কেন্দ্র করে প্রথম ১৮২৪ সালে আ্যাংলু-বার্মা যুদ্ধ সংগঠিত হয় বৃটিশ যুগের ভৌগোলিক নথিতে এমনটাই উল্লেখ আছে। নাফ সংলগ্ন এরিয়া হওয়ায় নেটং পাহাড়ের আঁকাবাকা রাস্তা থেকে ‘টেকনাফ’ নামকরণ করা হয়েছে বলে ধারণা স্থানীয়দের। তবে স্পষ্ট কোনো পুরনো নাম বা লিখিত রেকর্ড কম পাওয়া গেছে। পরিবর্তে বিভিন্ন মানচিত্র ও বর্ণনায় ‘শাহতপুরি’ ও ‘টিকানাপা’ রূপে আলাপ এসেছে। ১৯৩০ সালে টেকনাফ থানা গঠনের পর সীমান্ত ও বাজারপথ হিসেবে মানুষজনের যাতায়াত এবং বাণিজ্যে গুরুত্ব বাড়ে। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর মিয়ানমার সীমান্তবর্তী হওয়ায় আমদানি-রপ্তানিক বিষয়ে টেকনাফ গুরুত্ব পায়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সীমান্ত পাড়ি ও পাকিস্তানি বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবে এ অঞ্চলে আশ্রয় ও চলাচলের ঘটনা ঘটেছে। স্বাধীনতার ১যুগ পর ১৯৮৩ সালে টেকনাফ থানা উপজেলায় রূপান্তর হয়। ১৯৯১ সালে ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ে টেকনাফ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল ব্যাপক ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। শতশত বাড়িঘর, খেতখামার, মসজিদ-মাদ্রাসা নিম্নাঞ্চল বন্যার কবলে পড়ে। এরপর ১৯৯৪ সালের ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে, বাড়িঘর ধ্বংস ও মানুষজন বিপাকে পড়ে। ২০১৭ সালে মিয়ানমার অভ্যন্তরে সংঘাতের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নেয়। যার এক বড় অংশ টেকনাফের ঝুঁকিপূর্ণ বনভূমি ও পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয়ে আছে। এই প্রভাবের কারণে বনভূমি, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় জনজীবনে বড় পরিবর্তন শুরু হয়েছে। ২০২৩ সালে ঘূর্ণিঝড় ‘মোচা’ টেকনাফ উপকূলের কিছু অংশে আঘাত করার ফলে বেগবান বায়ু ও জলোচ্ছ্বাস দেখা দেয়। আজ টেকনাফের নাম উচ্চারণে বাংলার অন্যপ্রান্তে অনেকে ভ্রু কুঁচকে তাকায়! গুটিকয়েক অপরাধীদের কারণে পুরো এলাকার মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।

স্থানীয় জেলে সৈয়দুল ইসলাম বলেন, আমরা হাজারো জেলে সাগরে মাছ ধরে সৎভাবে সাধারণ জীবনযাপন করি। কিছু জেলে মাছ শিকারের আড়ালে অর্থের লোভে চোরাচালানে জড়িয়ে পড়ে। আমরা ভোরে সাগরে আসি, সন্ধ্যায় ফিরি। তাদের কারণে পুরো পেশাটাই আজ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এসব ব্যক্তিকে দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।

স্থানীয় কৃষক নুর জাহান বলেন, টেকনাফের মাটিতে এখনও আমাদের মতো গরিব কৃষক রোদে পুড়ে ফসল ফলায়। আমাদের ঘামে দেশের অর্থনীতি বেঁচে আছে।

স্থানীয় লবণচাষী ফয়জুল করিম বলেন, আমরা প্রতিবছর ঘামঝরা পরিশ্রমে লবণ উৎপাদন করে সংসার চালাই। দেশের জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছি। কিন্তু কিছু অপরাধীর কারণে পুরো টেকনাফকে দেশবাসী মাদকের রাজ্য হিসেবে দেখে। যা আমাদের মতো সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক।

চট্টগ্রাম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সিয়াম ইলাহী বলেন, টেকনাফের সন্তান হওয়ায় আমরা অনেক সময় অযথা হয়রানির শিকার হয়। পরিচয় দিলে তল্লাশিতে অতিরিক্ত সময় নেয় যা কোনো নাগরিকের জন্যই কাম্য নয়। মিয়ানমার থেকে আসা মাদক সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, এতে কিছু অসাধু ব্যক্তির জড়িত থাকা অসম্ভব নয়। মাদক চোরাচালান রোধে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে আরও শক্তিশালী ভূমিকা নিতে হবে। প্রয়োজনে সেনা মোতায়েনও বিবেচনা করা যেতে পারে।

স্থানীয় সমাজকর্মী ও মানবিক সংগঠক রবিউল হাসান মামুন বলেন, টেকনাফের পরিচয় দিয়ে বহুবার অযথা রোষানলের শিকার হয়েছি। সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদক প্রবেশরোধে প্রশাসনের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। পাশাপাশি কিছু জনপ্রতিনিধি মাদক কারবারিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়, যার ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে। ভৌগলিকভাবে টেকনাফ বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর অঞ্চলগুলোর একটি। এখানে পর্যটন উন্নয়ন ও বঙ্গোপসাগরে স্মার্ট ফিশিং চালু করা গেলে মানুষের নতুন আয়ের পথ তৈরি হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। মাদক বন্ধ করতে পারলে টেকনাফের ওপর চাপানো কলঙ্কও দূর হবে।

টেকনাফে প্রতিদিন অসংখ্য দরিদ্র মানুষ রোদ-বৃষ্টি সহ্য করে দেশের অর্থনীতিতে শ্রম দিচ্ছে। অথচ দেশের অন্যান্য স্থানে অনেক সময় সীমান্তের মানুষ ‘বিদেশি’ হিসেবে অবহেলার শিকার হয়। তারা সত্যিকারের বাংলাদেশি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চান। তাদের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও মর্যাদা সবই বাংলাদেশের জন্য।

এসসি/চখ

এই বিভাগের আরও খবর