chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

কর্ণফুলীর তীরে শুঁটকি উৎপাদনের ধুম, রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও

শুটকি তৈরির ভালো মৌসুম হচ্ছে শীত ও গ্রীষ্ম। এই দুই ঋতুকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরঘেঁষা অবস্থিত কর্ণফুলী উপজেলার ইছানগর, জুলধা, ডাঙ্গারচর এলাকায় শুঁটকিপল্লী এখন শুটকি শুঁকানো থেকে প্রক্রিয়াকরণ বেশ ব্যস্ত সময় কাটছে শ্রমিকদের । এই এলাকার শুঁটকির সুনামের সাথে দেশের চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে বিদেশেও। তাই কর্ণফুলীতে এখন শুঁটকি তৈরিতে চলছে ধুম, এখানকার গড়ে ওঠা শুঁটকিপল্লী এখন যেন চলছে কর্মমুখর উৎসব। তৈরি সারি সারি বাঁশের চাঙ ও মাচাঙ। কোনোটিতে লইট্ট্যা-ফাইশ্যা কোনোটিতে বিভিন্ন প্রজাতের মাছ। রোদে শুকানো হচ্ছে চিংড়ি, লইট্যা, ফাইস্যাসহ বিভিন্ন জাতের মাছ।

কর্ণফুলী নদীর পাড়ে গড়ে উঠা বিষমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন শুঁটকি শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন বিভিন্ন উপজেলার নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা। জেলেপল্লীতে শুঁটকির ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন কয়েক শতাধিক মানুষ। এবার এলাকাজুড়ে ২০টি মহালে কয়েক শতাধিক লোক শুঁটকি তৈরির কাজ করতেছেন। বিশেষ উপায়ে তৈরি বাঁশের মাচার উপর কাঁচা মাছ পাতলা করে বিছিয়ে সূর্যের তাপে শুকিয়ে তৈরি করা হয় শুঁটকি। সূর্যের তাপে ৫/৬ দিনের মধ্যেই কাঁচা মাছ শুকিয়ে গিয়ে শুঁটকিতে পরিণত হয় বলে জানান কর্মরত শ্রমিকরা।

এই শুটকি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করার কারণে এতে সরকারে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন হয়। চলতি মৌসুমে কর্ণফুলীর নদীরপাড়ে ৩ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। আগস্ট থেকে আগামী নভেম্বর  পর্যন্ত চলবে শুঁটকি তৈরির এ কাজ।

চট্টগ্রামের রসনা বিলাসিদের রসনায় শুঁটকি একটি জনপ্রিয় খাবার। শুঁটকি বললেই অনেকেরই জিভে আসে জল। আর সেটি যদি হয় চট্টগ্রামের শুঁটকি তাহলে তো কথাই নেই। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে এই শুঁটকি। চট্টগ্রামের শুঁটকির জনপ্রিয়তা সারা দেশে।

সরেজমিন দেখা যায়, তৈরি সারি সারি বাঁশের চাঙ ও মাচাঙ। কোনোটিতে লইট্ট্যা-ফাইশ্যা কোনোটিতে বিভিন্ন প্রজাতের মাছ।  জাহাজ থেকে আনা মাছ গুলো কেউ রোদে মাছ দিচ্ছেন, কেউ আবার অর্ধেক শুকানো শুঁটকি রোদ লাগার জন্য ওলটপালট করছেন। একদল বিভিন্ন জাতের মাছের পেট থেকে নাড়িভুঁড়ি বের করছে, অন্যদল সেগুলো ভালো করে ধুয়ে পরিস্কার করছে। এরপর মাছগুলো চাঙ ও মাচাঙে সারিবদ্ধভাবে দিচ্ছেন অন্যরা। ধীরে ধীরে তকতকে রোদে মাছ পুরোপুরি শুকিয়ে হয়ে যাচ্ছে স্বাদের শুঁটকি।

সংশ্নিষ্টরা জানান, ভোজনপ্রিয় বাঙালির পছন্দ ও স্বাদের শুঁটকি তুলে দিতেই শীত মৌসুমে টানা কয়েক মাস চলে এমন কর্মযজ্ঞ। আবহাওয়াজনিত কারণে কর্ণফুলীর তীরে প্রক্রিয়াজাত শুঁটকির স্বাদ ও গুণগত মানে অনন্য। এ সময় বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকে। এ জন্য কাঁচা মাছকে দ্রুত শুঁটকিতে পরিণত করা যায়।

এবার কর্ণফুলী নদীর শিকলবাহা, ইছানগর, ডাঙ্গারচর, ফিসারি ঘাট, কর্ণফুলী ঘাট, বাকলিয়া, রাজাখালী, চাক্তাই, চর চাক্তাইসহ বিভিন্ন পাড়ে চলছে শুঁটকি তৈরির কাজ। আগামী ডিসেম্বর  পর্যন্ত এ কর্মযজ্ঞ চলবে বলে জানিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর।

ডাঙ্গারচর এলাকার শুঁটকি মহালের ব্যবসায়ী আমির আহমেদ বলেন, ৮ বছর ধরে এখানে শুঁটকি ব্যবসা করছি। বছরে ৭ মাস শুঁটকি উৎপাদন করা গেলেও কাজ চলে ৬ মাস। তাও সাগরের মাছ শিকারের উপর নির্ভর করে। আমার মহালে ৫০ জন শ্রমিক কাজ করে। সাগরে মাছ বেশি পাওয়া গেলে শ্রমিকের সংখ্যাও বাড়ে। নদীরপাড়ের শুঁটকি গুলোতে শুধু লবণ ব্যবহার করা হয়। কোন কেমিক্যাল এখানে ব্যবহার হয় না। তাই এই শুঁটকি বিষমুক্ত। এ শুঁটকি দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন যাচ্ছে দুবাই, ওমানসহ বিভিন্ন দেশে। এতে সরকারে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন হচ্ছে।

কর্ণফুলী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো.আবদুল আলীম বলেন, চলতি মৌসুমে কর্ণফুলীর নদীরপাড়ে ৩ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। আগস্ট থেকে আগামী মার্চ পর্যন্ত চলবে শুঁটকি তৈরির এ কাজ। কর্ণফুলীতে শিকলবাহা, ইছানগর ও ডাঙ্গারচরে ২০টি শুঁটকি মহাল রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কর্ণফুলীতে আধুনিকমানের শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পস্থাপন প্রকল্প এখনও হয়নি। এধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ শুঁটকি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মৎস্য অফিস থেকে প্রতিনিয়ত পরার্মশ দেওয়া হচ্ছে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদনের জন্য। শুঁটকি তৈরী কাজে নিয়োজি শ্রমিকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণও করা হবে বলে জানান তিনি।

তাসু/চখ

এই বিভাগের আরও খবর