chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

মোবাইলে বন্দি শৈশব: সুবিধার ভিড়ে বেড়ে উঠছে অদৃশ্য ঝুঁকি

প্রযুক্তির অগ্রগতিতে বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। তবে স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা শিশু-কিশোরদের জীবনযাপনে যে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে পরিবার ও সমাজে।

বাড়ির ভেতরে আগের মতো গল্প, আড্ডা বা একসাথে সময় কাটানোর পরিবেশ কমে যাচ্ছে। খাবার টেবিলেও শিশুরা চোখ রাখছে মোবাইল স্ক্রিনে, আর এতে বাড়ছে পারিবারিক দূরত্ব।

কক্সবাজার ‘শহর থেকে গ্রাম’ সর্বত্রে খবর নিয়ে জানা গেছে অধিকাংশ এলাকা ও পরিবারে এমনই
অবস্থা চলছে এখন।

প্রবীণ সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলায় আমরা দলবেঁধে মাঠে খেলতে যেতাম, আড্ডা দিতাম। এখন সেই দৃশ্য আর তেমন চোখে পড়ে না, বরং দেখা যায় দল বেঁধে মোবাইলে গেম খেলছে শিশু-কিশোররা।

তিনি আরও বলেন, সংবাদ পেশায় আসার পর কত কষ্ট করে ফ্যাক্সে সংবাদ পাঠাতে হতো, কখনো আবার গাড়ি ধরে নিজ হাতে লিখে পত্রিকা অফিসে পৌঁছে দিতে হতো। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে এখন এসব ঝামেলা নেই-অনেক কিছুই সহজ হয়ে গেছে। তবে এই প্রযুক্তিই মানুষের জীবনযাত্রাকে যেমন সহজ করছে, তেমনি অনেক কঠিন অবস্থার মধ্যেও ফেলে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টফোন শিশুদের শেখা, বিনোদন, জ্ঞান অর্জনকে সহজ করলেও অতিরিক্ত ব্যবহার, সামাজিকতা, আচরণ, মানসিক স্বাস্থ্য ও পারিবারিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব, অনলাইন লার্নিং অ্যাপ-সব মিলিয়ে শিশুদের শেখার সুযোগ বহুগুণে বেড়েছে।

অনলাইন ক্লাস, টিউটোরিয়াল, স্টাডি অ্যাপের মাধ্যমে ঘরে বসেই বিভিন্ন বিষয়ে শেখা সম্ভব হচ্ছে।

যেমন-শিশুদের কৌতূহল বাড়ছে, তেমনি পৃথিবীর নানা বিষয়ে সহজেই জানতে পারছে শিশু-কিশোররা। অ্যানিমেশন বানানো, আঁকাআঁকি, কোডিংসহ নানা দক্ষতা শেখার প্ল্যাটফর্ম পেয়ে শিশুরা আরও নতুন কিছু শেখার সুযোগ পাচ্ছে। এমন কী শিশুরা বাইরে গেলে লোকেশন শেয়ার বা জরুরি যোগাযোগের সুবিধাও অভিভাবকদের কাছে স্বস্তি এনে দিচ্ছে প্রযুক্তি।

প্রযুক্তির এত এত সুবিধার ভিড়ে স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন অনেক অভিভাবকরা।

স্কুল পড়ুয়া এক ছাত্রের বাবা আশিকুর রহমান বলেছেন, প্রযুক্তিতে যেমন ভালো দিক রয়েছে, তেমনি খারাপ দিকও দেখা দিয়েছে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণতে। টিকটক, বিভিন্ন অনলাইন গেম এবং ইউটিউবের অনিয়ন্ত্রিত কনটেন্ট এখন শিশুদের আচরণ, চিন্তা ও জীবনধারায় গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সহজে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধায় শিশুরা খুব অল্প বয়সেই এসব প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করছে, যেখানে বয়স-অনুপযোগী ভিডিও, সহিংসতা, অশালীনতা, বিভ্রান্তিকর তথ্য কিংবা নকল-চ্যালেঞ্জভিত্তিক কনটেন্টের সাথে পরিচিত হয়ে উঠছে।

ফলস্বরূপ, তাদের স্বাভাবিক কৌতূহল এবং শেখার ইচ্ছা বিকৃত হচ্ছে, মনোযোগের স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে, রাগ-আচরণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, এমনকি বাস্তবতা বোধেও তৈরি হচ্ছে বিচ্যুতি।

প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুরা যখন বারবার দ্রুতগতির ও উত্তেজনামূলক কনটেন্ট দেখে, তখন তাদের মস্তিষ্ক উত্তেজনা-নির্ভর হয়ে পড়ে-যা পড়াশোনা, পরিবারে যোগাযোগ বা স্বাভাবিক খেলাধুলাকে কম আকর্ষণীয় করে তোলে। পাশাপাশি এসব কনটেন্টে অনুকরণের প্রবণতা থাকায় শিশুরা অজান্তেই ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ শিখে ফেলছে।

সামাজিক যোগাযোগের জায়গায় ভার্চুয়াল দুনিয়া দখল করে নিচ্ছে, যা তাদের আত্মবিশ্বাস, সামাজিক দক্ষতা ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।

শহরের প্রবীণ মুরুব্বি শাহাব উদ্দিন বলেন, সঠিক নজরদারি ছাড়া ডিজিটাল দুনিয়া শিশুদের জন্য অদৃশ্য বিপদ। তাই নিয়ন্ত্রিত কনটেন্ট, সময়সীমা নির্ধারণ, প্যারেন্টাল কন্ট্রোল এবং সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা-এগুলো আজ অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।

মোজাম্মেল হক নামে এক স্কুল শিক্ষক বলেছেন, পরিবারের সদস্যরা একই ঘরে থেকেও যে যার মতো মোবাইলে ডুবে থাকে। শিশুরা বাবা-মায়ের সাথে কথা বলার বদলে মোবাইলের স্ক্রিনে বেশি সময় কাটায়। মাঠে খেলা, বন্ধুদের সাথে সরাসরি সময় কাটানো অনেকেটাই কমে গেছে। ফলে দলগত আচরণ, নেতৃত্ব, যোগাযোগ দক্ষতা দুর্বল হচ্ছে দিন দিন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত মোবাইল বা কমপিউটার ব্যবহারের ফলে ঘুমের ব্যাঘাত, অস্থিরতা, মনোযোগ কমে যাওয়া, ভয় বা উদ্বেগের মতো সমস্যায় ভুগছে অধিকাংশ মানুষ। সেখানে শিশু কিশোররাও বাদ যাচ্ছে না। চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, মোটা হয়ে যাওয়া এবং শারীরিক কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে।

আইটি শিক্ষক অংশুমান বড়ুয়া আদিত্য বলেন, স্মার্টফোন আজকের সময়ের অপরিহার্য বাস্তবতা। এ থেকে শিশুদের সম্পূর্ণ দূরে রাখা সম্ভব নয়।

তবে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি ক্ষতির দিকগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ, স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

এসসি/চখ