chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে

বিরিয়ানিতে স্বাদ বাড়ানোর নামে সর্বনাশ

জনপ্রিয় বিরিয়ানির মতো মুখরোচক খাবারে ঢুকে পড়েছে ভেজাল কেমিক্যাল। স্বাদ ও সুবাস বাড়ানোর নামে নগরীর বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয় ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষতিকর কেমিক্যাল কেওড়া জল। অথচ এ উপাদান খাদ্যপণ্য নয়, বরং আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই অবৈধ ব্যবহার ধীরে ধীরে ভোক্তাদের স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।

গত এক সপ্তাহের মধ্যে চট্টগ্রাম নগরের একাধিক রেস্তোরাঁয় কেওড়া জল ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সর্বশেষ গতকাল বহদ্দারহাট এলাকার বিসমিল্লাহ ওরশ বিরিয়ানি এবং মেজ্জান রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহারের প্রমাণ মেলে। তার আগে গত মঙ্গলবারের অভিযানে ‘কাচ্চি ডাইন’ ও ‘কেএফসি’ নামের প্রতিষ্ঠানে একই অপরাধ ধরা পড়ে। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন—অভিযানের মাধ্যমে কেবল অল্প কিছু ধরা পড়ছে, অথচ নগরের অনেক রেস্তোরাঁতেই এ ধরনের অবৈধ কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, খাবারে কেওড়া জল বা অন্য কোনো কৃত্রিম সুগন্ধি ব্যবহার সম্পূর্ণ অবৈধ। কেওড়া জল খাবারের কোনো উপাদান নয়, এটি কেমিক্যাল। নিরাপদ খাদ্য আইনে এটি নিষিদ্ধ। অথচ রেস্তোরাঁ মালিকরা সস্তা ও সহজলভ্য বলে প্রাকৃতিক মশলার পরিবর্তে কেমিক্যাল ব্যবহার করছে, যা সরাসরি মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর।

তিনি জানান, কেওড়া জল সাধারণত মুসলিম সমাজে মৃত্যুর পর লাশ বা মিলাদ মাহফিলের মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অথচ সেই কেমিক্যাল এখন খাবারে মেশানো হচ্ছে—যা নিতান্তই ভয়াবহ।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, রেস্তোরাঁ মালিকরা ভালো মানের দারুচিনি, এলাচি, গোলাপের মতো প্রাকৃতিক সুগন্ধি মশলার বদলে বোতলজাত কেমিক্যাল ব্যবহার করছে। এতে খরচ কম হয়, কিন্তু ভোক্তাদের জীবনের ওপর তৈরি হয় ঝুঁকি। অথচ তারা ভালো করেই জানেন—খাবারে কেমিক্যাল ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগের সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, খাবারের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে কেওড়া জলসহ কেমিক্যালের ব্যবহার ভোক্তার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন। টাকা দিয়ে খাবার কিনে মানুষ আসলে বিষ কিনছে। এটি শুধু খাদ্যনিরাপত্তা আইন ভঙ্গ নয়, সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘনও বটে। অবিলম্বে এসব কেমিক্যালজাত কেওড়া জল বাজার থেকে প্রত্যাহার করতে হবে এবং যারা ব্যবহার করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম কেওড়া জলে উচ্চমাত্রার সিনথেটিক কেমিক্যাল থাকে যা শরীরে প্রবেশ করলে ধীরে ধীরে লিভার, কিডনি, হজমতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে শিশুদের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, অ্যালার্জি ও ত্বকের সমস্যা, দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হয়।

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক ডা. সুশান্ত বড়ুয়া বলেন, খাবারের স্বাদ বা সুবাস বাড়ানোর নামে কেওড়া জল ব্যবহার মানে ভোক্তাদের ধীরে ধীরে বিষ খাওয়ানো। এ ধরনের রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করলে লিভার ও কিডনির কার্যক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়, ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়। এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। তাই প্রাকৃতিক মশলা ব্যবহারের বিকল্প নেই এবং ক্ষতিকর কেওড়া জল অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

সাধারণ ভোক্তারা বলছেন, জরিমানার পাশাপাশি এসব অপরাধের জন্য জেলও দেওয়া উচিত। অন্যথায় ব্যবসায়ীরা বারবার একই অপরাধ করবে। তাদের মতে, খাবারে ভেজাল কেমিক্যাল শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, পুরো সমাজের জন্য খাদ্যনিরাপত্তার ভয়াবহ হুমকি তৈরি করছে।

ফখ|চখ

এই বিভাগের আরও খবর