বিশেষ প্রতিবেদন
আয়ুষ্কাল নেই রেলের ৫১% ইঞ্জিনের
বাংলাদেশের রেলওয়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিস্তৃত করতে গত ১৬ বছরে দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ হয়েছে। এ বিনিয়োগের ফলে নতুন রেলপথ চালু হয়েছে ২৫৮ কি.মি। এ ছাড়া ৫৩৩ কি. মি রেলপথ ডুয়াল-গেজে রপান্তর এবং ৫০০ কিলোমিটারের মতো রেলপথ ডাবল লাইন করা হয়েছে। এ সব বিনিয়োগে রেলওয়ে ট্র্যাক ও কোচের সংখ্যা বাড়লেও ইঞ্জিন সংকট কাটাতে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বাংলাদেশ রেলওয়ে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য বলছে, বর্তমানে রেলের বহরে মোট ইঞ্জিন রয়েছে ২৯৭টি। এর মধ্যে মিটারগেজ ইঞ্জিন ১৬৭টি ও ব্রডগেজ ইঞ্জিন ১৩০টি। রেলট্র্যাকে যুক্ত হওয়ার পর একটি ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হয় ২০ বছর।
অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল রয়েছে রেলওয়েতে এমন ইঞ্জিনের সংখ্যা ১৪৭টি। বাকি ১৫০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৫০টি ও ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী রয়েছে ১৬টি। অবশিষ্ট ৮৪টি ইঞ্জিনের বয়স ৪০ বছর পেরিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে বর্তমান রেলওয়ের বহরে থাকা ইঞ্জিনগুলোর মধ্যে ৫১ শতাংশের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পূর্বাঞ্চলে বন্ধ থাকা ময়মনসিংহ-দেওয়ানগঞ্জ বাজার ও ময়মনসিংহ-ভৈরব বাজার, সিলেট-ছাতকবাজার এবং চট্টগ্রাম-সিলেট জালালাবাগ এক্সপ্রেস, ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের ঈশা খাঁ এক্সপ্রেস, চট্টগ্রাম-দোহাজারী রুটের দোহাজারী কমিউটার, আখাউড়া-সিলেট রুটের কুশিয়ারা এক্সপ্রেস ইঞ্জিন সংকটে বন্ধ আছে।
এছাড়া চট্টগ্রাম-নাজিরহাট রুটের নাজিরহাট কমিউটার, চট্টগ্রাম-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-চট্টগ্রাম রুটের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কমিউটার ১/২/৩/৪ ট্রেন, লাকসাম-চাঁদপুর-লাকসাম রুটের চাঁদপুর কমিউটার ট্রেন, লাকসাম-নোয়াখালী-লাকসাম রুটের নোয়াখালী কমিউটার ট্রেন, চট্টগ্রাম-পটিয়া-চট্টগ্রাম রুটের পটিয়া কমিউটার ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে।
এছাড়া পূর্বাঞ্চলের ঢাকা-যমুনা সেতু পূর্ব রুটে টাঙ্গাইল কমিউটার, ময়মনসিংহ ভুয়াপুর রুটের ধলেশ্বরী কমিউটার বন্ধ হয়ে গেছে। এই দুটি ট্রেন বন্ধ হওয়ার কারণ হিসেবে ইঞ্জিন স্বল্পতার কথা বলা হয়েছে।
পশ্চিমাঞ্চলের বন্ধ থাকা ট্রেনের কারণ হিসেবে কোচ, ইঞ্জিন ও ক্রু সংকটের কথা বলেছে রেলওয়ে। পার্বতীপুর-লালমনিরহাট রুটের পার্বতীপুর কমিউটার, লালমনিরহাট-সান্তাহার রুটের ট্রেন ২০১২ দুটি ট্রেন বন্ধের কারণ হিসেবে ক্রুর অভাবের কথা বলা হয়েছে।
সান্তাহার-পঞ্চগড় রুটের উত্তরবঙ্গ মেইল ২০২১ সালের ১৯ আগস্ট বন্ধ হয়ে যায়। এটি বন্ধের পেছনে ইঞ্জিন ও ক্রু সংকটের কথা বলা হয়েছে। লালমনিরহাট-পার্বতীপুর রুটের রংপুর কমিউটার, পার্বতীপুর- পঞ্চগড় রুটের পঞ্চগড় কমিউটার ট্রেন দুটি বন্ধের কারণ হিসেবে ইঞ্জিন আন্ডার রিপেয়ার থাকার কথা বলা হয়।
নতুন রেলপথে বাড়েনি ট্রেন, বাড়ছে না আয়
ঢাকা–যশোর (পদ্মা রেল লিঙ্ক) রেলপথ ৩৯ হাজার কোটি টাকা দিয়ে ১৭০ কি মি দৈর্ঘ্যে নির্মাণ করা হলেও এ রুটে নতুন ট্রেন চালু হয়েছে মাত্র দুইটি। ঢাকা-যশোর-বেনাপোল রুটে রুপসী বাংলা এক্সপ্রেস ও ঢাকা-যশোর-খুলনা রুটে জাহানাবাদ এক্সপ্রেস চালু হয়েছে।
এই দুইটি ট্রেনে সাড়ে তিন ঘণ্টায় খুলনা ও বেনাপোল থেকে এবং আড়াই ঘণ্টায় যশোর থেকে ঢাকা যাওয়া যাচ্ছে। দ্রুত সময়ে অল্প খরচে যাতায়ত করতে পারায় এই দুই ট্রেনের যাত্রী চাহিদা অনেক।আরও ট্রেনের চাহিদা থাকলেও ইঞ্জিন সংকটে নতুন ট্রেন নামাতে পারছে না রেলওয়ে।
খুলনা–মোংলা রেললাইন ৬৫ কিমি দীর্ঘ নতুন রেললাইন ৪ হাজার ২৬০ কোটি টাকা নির্মিত হয়েছে, যা খুলনা মহানগরকে মোংলা বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ট্রেন চলছে মাত্র একটি।
খুলনা-যশোর-বেনাপোল রুটে বেতনা এক্সপ্রেস নামে একটি লোকাল ট্রেন ও খুলনার ফুলতলা জংশন-মোংলা রুটে ‘মোংলা কমিউটার’ নামে একটি ট্রেন চলাচল করছে। দুইটি ট্রেন নামে হলেও একটি ট্রেনই দুই নামে চলছে।
চট্টগ্রাম–কক্সবাজার প্রায় ১২০ কিমি দীর্ঘ এই রেলপথ এখন বাংলাদেশ রেলওয়ের আয়ের অন্যতম প্রধান রুট। যদিও প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ রুটে চলাচল করছে ৪ টি ট্রেন।
এরমধ্যে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে পর্যটক এক্সপ্রেস ও কক্সবাজার এক্সপ্রেস এবং চট্টগ্রাম থেকে প্রবাল এক্সপ্রেস ও সৈকত এক্সপ্রেস চলাচল করছে। রেলওয়ের আয়ের ক্ষেত্রে প্রধান রুট হলেও ইঞ্জিন সংকটে বাড়ানো সম্ভব হয়নি ট্রেন।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেল সংযোগ তৈরি করতে ১২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের আখাউড়া–আগরতলা রুট নির্মাণ করতে খরচ হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু এ রুটে চালু হয়নি কোন ট্রেন।
ঢাকা-হাইটেক সিটি-ঢাকা রুট নতুন নির্মাণ করে কালিয়াকৈর কমিউটার নামে একটি ট্রেন চালু করা হলেও এটি বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, “সমস্যার সমাধান হচ্ছে না কারণ রেলের ইঞ্জিন আমাদের দেশে উৎপাদন হয় না, বিদেশ থেকে আনতে হয়। আমরা আজ যদি অর্থের সংস্থান পাই তাহলে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অর্ডার দিলে ইঞ্জিন পেতে মিনিমাম দুই থেকে তিন বছর সময় লাগে।”
তিনি বলেন, “মিটারগেজ ও ব্রডগেজ মিলে আমাদের এখন ৯০টির মতো ইঞ্জিন প্রয়োজন। নতুন ইঞ্জিন কেনার জন্য আমাদের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। প্রথম ধাপে এডিবির অর্থায়নে মিটারগেজের জন্য ৩০টি ইঞ্জিন কেনার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।”
◑ ফখ|চখ
