মাছের ‘লোভে’ জেলেদের জীবনবাজি
কক্সবাজারের টেকনাফে নাফ নদী ও সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের প্রায়ই অস্ত্রের মুখে অপহরণ করছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। গত ২২ দিনে অন্তত ৫৮ জনকে অপহরণ করে মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন ও জেলেদের সূত্রে জানা গেছে। তারপরও মাছের লোভ ছাড়তে পারছেন না জেলেরা।
গত শুক্রবার নাফ নদীর জলসীমার শূন্যরেখা অতিক্রম করে মিয়ানমারে অভ্যন্তরে মাছ ধরার সময় বাংলাদেশি ১৯টি ট্রলারসহ ১২২ জেলেকে আটক করে ফেরত এনেছেন কোস্টগার্ড।
মিয়ানমারের মংডুর সঙ্গে বাংলাদেশের ২৭০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। নাফ নদীটি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমানা ভাগ করে রেখেছে। মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে টানা ১১ মাসের সংঘাতের পর গত বছরের আগস্টে রাখাইনের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মংডু শহর নিয়ন্ত্রণ নেয় আরাকান আর্মি।
জেলেরা জানান, গত ৫ আগস্ট থেকে জেলেদের অপহরণের ঘটনা বেড়েছে। তবে এর আগেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। গত ১৩ জুন তিনটি নৌযান অস্ত্রের মুখে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। মাছ ধরার নৌযানগুলোর প্রতিটিতে ৬ থেকে ৮ জন করে জেলে ছিল। পরে তাঁদের মারধর ও মাছ লুটপাট করে ছেড়ে দেওয়া হয়।
গত ১২ মে টেকনাফের হ্নীলাসংলগ্ন নাফ নদী থেকে সিদ্দিক হোসেন (২৭), রবিউল আলম (২৭) ও মাহমুদ হোসেন (৩০) নামের তিন বাংলাদেশিকে নৌকাসহ ধরে নিয়ে আরাকান আর্মি। দুই দিন পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ৫ মার্চ সেন্ট মার্টিন উপকূলে মাছ ধরার সময় ৬টি নৌযানসহ প্রায় ৫৬ জেলেকে ধরে নিয়ে যায় মিয়ানমারের নৌবাহিনীর সদস্যরা। গত ২০ ফেব্রুয়ারি টেকনাফের নাফ নদী থেকে ৪টি মাছ ধরার নৌকাসহ ১৯ বাংলাদেশি জেলেকে ধরে নিয়ে যায়। এর মধ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় কয়েক দফায় ১৮৯ জন জেলে এবং ২৭টি নৌযান ফেরত আনা হয়েছে।
শাহপরীর দ্বীপ মাঝেরপাড়া ঘাট ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আবদুল গফুর বলেন, একের পর এক জেলে অপহরণের ঘটনা ঘটছে। জেলেরা শঙ্কিত, আতঙ্কগ্রস্ত।
জানা গেছে, টেকনাফের পৌরসভার কায়ুকখালিয়া ঘাট থেকে প্রতিদিন প্রায় ২৫০টি মাছ ধরার নৌযানে তিন হাজার জেলে নাফ নদীর মোহনা ও সাগরে মাছ ধরতে যায়। অনেক জেলে অতিরিক্ত মাছের লোভে নাফ নদীর জলসীমার শূন্যরেখায় গিয়ে জীবনবাজি রেখে মাছ ধরতে যায়। এসময় মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির টার্গেটে পড়ে অপহরণ হন।
টেকনাফ ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি সাজেদ আহমদ বলেন, সাগর ও নদীর মোহনায় মাছ ধরতে গিয়ে এখন টেকনাফের জেলেদের সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। অস্ত্রের মুখে জেলেদের অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে আরাকান আর্মি। অনেক সময় নৌযানে থাকা মাছ, জ্বালানি, খাদ্যসামগ্রীসহ অন্যান্য মালামাল লুট করা হচ্ছে।

শাহপরীর দ্বীপ ক্ষুদ্র মৎস্য সমিতির সভাপতি আবদুল গনি বলেন, জেলেদের অপহরণের বিষয়টি বিজিবি ও কোস্টগার্ডকে অবহিত করা হয়েছে। আরাকান আর্মির কাছ থেকে তাদের উদ্ধার করা যায়নি। তাদের পরিবার খুবই দুশ্চিন্তায় রয়েছে।
জেলেদের মুক্ত করার চেষ্টা চলছে: বিজিবি
কক্সবাজারের টেকনাফের নাফ নদী ও সাগরের উপকূল থেকে আরাকান আর্মি যেসব বাংলাদেশি জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে, তাদের মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে বিজিবি। বিষয়টি নিয়ে বিজিবি মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ করছে। চিঠিও পাঠিয়েছে।
বিজিবি রামু সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আরাকান আর্মির হাতে অপহরণ নয়, জলসীমান্তের শূন্যরেখা অতিক্রম করে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ায় নাফ নদী ও সাগর মোহনা থেকে বাংলাদেশি জেলে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে থাকা পুরো সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ এখন মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে। আর দেশটির অভ্যন্তরে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ ও সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে সক্রিয় উঠেছে রোহিঙ্গাদের কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীও। এ কারণে সীমান্তে আরাকান আর্মির তৎপরতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে নাফ নদী ও সাগর মোহনায় জলসীমার শূন্যরেখা অতিক্রমকারী জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।
সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, নাফ নদী ও সাগরের যেসব এলাকায় ঘটনাগুলো হচ্ছে, সেটা বিজিবির দায়িত্বপূর্ণ এলাকা না হলেও বিষয়গুলো নিয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে সংকট নিরসনের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশি জেলেরা ভুল করে মিয়ানমারের জল সীমায় ঢুকে পড়ছেন বলে জানান কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, নাফ নদীর মোহনাসংলগ্ন কয়েকটি এলাকায় ডুবোচরের সৃষ্টি হয়েছে। এতে সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে ভুল করে মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকে পড়েন। এতে আরাকান আর্মির হাতে বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।
এ নিয়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ হচ্ছে বলে জানান বিজিবির এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত বাংলাদেশি ৫১ জন জেলে আরাকান আর্মির কাছে আটক রয়েছেন। সীমান্ত নন-ফ্যাক্টর গোষ্ঠী হলেও তাদের সঙ্গে বিজিবির আন-অফিশিয়াল যোগাযোগ রয়েছে।
মিয়ানমারের জলসীমায় প্রবেশ ১২২ জেলে
নাফ নদীর জলসীমার শূন্যরেখা অতিক্রম করে মিয়ানমারে অভ্যন্তরে মাছ ধরার সময় গত শুক্রবার বাংলাদেশি ১৯টি ট্রলারসহ ১২২ জেলেকে আটক করে ফেরত নিয়ে আসা হয়েছে। এদের মধ্য ৯৩ রোহিঙ্গা রয়েছে।
কোস্ট গার্ড টেকনাফ স্টেশনের ইনচার্জ লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সালাহউদ্দিন রশীদ তানভীর বলেন, “মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ লাগোয়া পুরো সীমান্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ এখন দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে। এতে নাফ নদীর জলসীমার শূন্যরেখা অতিক্রম করে মিয়ানমার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়া বাংলাদেশি জেলেদের আরাকান আর্মির ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে।”
এমন পরিস্থিতিতে অভিযান চালিয়ে নাফ নদীর জলসীমার শূন্যরেখা অতিক্রম করে মিয়ানমারে অভ্যন্তরে মাছ ধরার সময় বাংলাদেশি ১৯টি ট্রলারসহ ১২২ জেলেকে আটক করে ফেরত নিয়ে আসা হয়েছে।
এদিকে, ট্রলার মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ২৮ আগস্ট পর্যন্ত ২৩ দিনে আরাকান আর্মি ১০টি ট্রলারসহ ৬৩ জন জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে।
গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে গোষ্ঠীটি ২৬৭ বাংলাদেশি জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে। তাদের মধ্যে ১৮৯ জনকে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে।
◑ ফখ|তাসু|চখ
