chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

ফটিকছড়ি ও হাতিয়ায় ‘মব’ সৃষ্টি করে হত্যার নেপথ্যে? 

ফটিকছড়ি ও হাতিয়ায় ‘মব’ সৃষ্টি করে হত্যা ও হেনস্তার নেপথ্যে নানা তথ্য বেরিয়ে এসেছে। নিরপরাধ দুটি তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে কিছু অমানবিক মানুষ। মৃত্যুর মতো ঘটনায় উল্লাসে মেতেছে তারা। 

শুক্রবার ভোরে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে চোর সন্দেহে মব সৃষ্টি করে তিন কিশোরকে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। এ মারধরের ঘটনায় মো. রিহান নামের এক কিশোর নিহত হয়েছে।

এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার নোয়াখালীর হাতিয়ায় চোর সন্দেকে প্রকাশ্য পিডিবির ঠিকাদারের দুই কর্মীকে মারধরের ঘটনা ঘটে। এতে একজন নিহত হন। একইদিন কুমিল্লায় চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে এক তরুণকে হাত-পা বেঁধে হত্যা করা হয়।

এর আগে গত ৯ আগস্ট রংপুরের তারাগঞ্জে চোর সন্দেহে মব সৃষ্টি করে রূপলাল দাস ও প্রদীপ লাল নামের দুই ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও পরে সরে পড়ে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের মবের ঘটনা কমে এলেও তা একেবারে নির্মূল হয়নি। বরং পরিকল্পিতাভাবে একদল মানুষ এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। আর এর কারণ প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা। মব সৃষ্টি করে হত্যার ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকে, এমনকি পুলিশের সামনে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও তারা থাকছেন নির্লিপ্ত। অন্যদিকে অপরাধীদের গ্রেফতারেও দেখা যায় গড়িমসি। মামলা নিতেও পুলিশ টালবাহানা করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে অপরাধীরা উৎসাহিত হয়।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে তিন কিশোরকে চোর সন্দেহে বেঁধে পেটানোর ঘটনায় ঘটনাস্থলেই এক কিশোর নিহত হয়েছে। গতকাল ভোরে উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের চেইঙ্গার সেতু এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

পুলিশ বলছে, পূর্বের বিরোধ থেকে চোর সন্দেহের নাটক সাজিয়ে পেটানো হয়েছে। 

নিহত কিশোরের নাম মো. রিহান মহিন (১৫)। সে একই গ্রামের সাগর আলী তালুকদার বাড়ির মুদিদোকানি মুহাম্মদ লোকমানের ছেলে।

পরিবারের বরাত দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওই কিশোর তিন বন্ধুসহ এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফিরছিলেন। পরে পরিকল্পিতভাবে ‘মব’ করে পেটানো হয়েছে। এ ঘটনায় রিহানের দুই সমবয়সি বন্ধু মুহাম্মদ মানিক ও মুহাম্মদ রাহাত গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ জানায়, নিহত রিহান বাবার মুদিদোকানে সহযোগী হিসেবে কাজ করত। বৃহস্পতিবার তারা চট্টগ্রাম নগরে বেড়াতে যায়। রাতে তারা বাড়ি ফিরছিল। তিনটার দিকে বাড়ির কাছে এলে আগে থেকে অপেক্ষায় থাকা ৭ থেকে ৮ জন যুবক তাদের চোর আখ্যা দিয়ে ধাওয়া দেন। এরপর এ তিনজন দৌড়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে যুবকেরা ধরে এনে সেতুর ওপর আনেন। এরপর তিন কিশোরকে রশি দিয়ে বেঁধে ‘মব’ করে বেধড়ক মারধর করেন। এতে ঘটনাস্থলেই রিহানের মৃত্যু হয়। পরে স্থানীয় কিছু বাসিন্দা গুরুতর আহত মানিক ও রাহাতকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেন।

এদিকে এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দুই যুবককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।

ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর আহমদ বলেন, ওই তিন কিশোর নগরে বেড়াতে গিয়ে মধ্যরাতে বাড়ি ফিরছিল। কেন, কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে তা তদন্ত করা হচ্ছে। পরিবারকে মামলা করতে বলা হয়েছে। পুলিশ মূল হামলাকারীদের গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছে।

এদিকে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় চোর সন্দেহে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ঠিকাদারের দুই কর্মীকে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। মারধরের সময় ঘটনাস্থলেই একজনের মৃত্যু হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উপজেলার জাহাজমারা বাজারে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তির নাম মো. লোকমান (৩৫)। আহত হয়েছেন পিডিবির ঠিকাদারের আরেক কর্মী মো. মোস্তাফিজ।

আহত মো. মোস্তাফিজ গণমাধ্যমকে বলেন, তাদের ঠিকাদার বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের কাজ শেষ করার পর অপ্রয়োজনীয় কিছু মালামাল এক ভাঙারি ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করেন। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিনি ও লোকমান ওই মালামাল নিয়ে ভাঙারির দোকানে যান। এ সময় তারেক আজিজ নামের ওই ব্যক্তি এসব মালামাল চুরির বলে অভিযোগ করেন। তারা প্রকৃত ঘটনা জানানোর পরও তাদের দুজনকে বেঁধে মারধর করা হয়।

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের মারধর করার সময় প্রায় ২০০ লোক সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এরপরও তারেক আজিজ আমাদের চোর আখ্যা দিয়ে বেঁধে রাখেন। কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশও ঘটনাস্থলে আসে। এর পরপর লোকমানের মৃত্যু হয়।’

এ বিষয়ে হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কে এম  আজমল হুদা বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ যাওয়ার কিছুক্ষণ পর লোকমান ঘটনাস্থলে মারা গেছেন। প্রাথমিক তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা অনুযায়ী লোকমানকে মারধরের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযুক্ত তারেক আজিজকে আটক করা হয়েছে।

এদিকে কুমিল্লার নগরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজির অভিযোগে এক তরুণকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নগরের অশোকতলা বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত তরুণের নাম মো. সায়েম (২৪)।

পুলিশের ভাষ্য, ওই যুবক পেশাদার ‘ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজ’।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিসিক শিল্পনগরীর জান্নাত ফুড প্রোডাক্টস নামের একটি কারখানায় উৎপাদিত শনপাপড়ি খেতে গিয়ে চাঁদা দাবি করেন সায়েম। এ সময় সেখানে হাত-পা বেঁধে তাকে আটকে মারধর করেন স্থানীয় একদল লোক। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সায়েমকে মৃত ঘোষণা করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় অন্তত তিন বাসিন্দা গণমাধ্যমকে বলেন, ওই যুবক আরো কয়েকজনসহ এলাকায় চুরি ও ছিনতাই করতেন। এ জন্য মানুষ তার ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন। কিন্তু এভাবে পিটিয়ে হত্যা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। তাকে চাঁদা দাবির সময় আটকের পর পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া যেত।

এর আগে গত ৯ আগস্ট চোর সন্দেহে তারাগঞ্জে রূপলাল দাস ও প্রদীপ দাস নামের দুইজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় পুলিশ ঘটনস্থলে থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এনে চলে যায়। প্রদীপ দাস সম্পর্কে রূপলাল দাসের ভাগনির স্বামী ছিলেন।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রূপলাল দাস জুতা সেলাইয়ের কাজ করতেন। আর প্রদীপ দাস ভ্যান চালাতেন।

এ হত্যার ঘটনায় করা মামলার এজাহারের সঙ্গে ঘটনার মিল নেই বলে অভিযোগ করেছেন নিহতের স্বাজনরা। পুলিশ নিজের মতো করে মামলা লিখে রূপলালের বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রীর কাছ থেকে সই নিয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।

রূপলালের ছেলে জয়দাস বলেন, তার বাবাকে যখন মারা হয়, তখন পুলিশ ঘটনাস্থলে ছিল। কিন্তু সে কথা মামলায় লেখেনি। মামলায় লেখেছে, পুলিশ নাকি তাকে হাসপাতালে দেখছে! তার অভিযোগ, ‘এই মামলা ওরা (পুলিশ) নিজে নিজে থানায় মনমতো লেখে আমার মার সাইন নিছে। আমার বাবার গায়ে দোষ দিয়া মামলা লেখছে। পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।’

ফখ|চখ
এই বিভাগের আরও খবর