chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

অন্তর্বর্তী সরকারের ১ বছর : প্রত্যাশার চাপ, হাঁটি হাঁটি অগ্রগতি

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের বছর ঘুরে গেল। ১৬ বছরের ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছিল ৩৬ দিনের রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। এরপর গত বছরের আজকের দিনে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দায়িত্ব নেয় বর্তমান সরকার। নানা কারণে সরকারের প্রতি গণমানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক। রাষ্ট্রীয়, প্রশাসনিক ও বিচারব্যবস্থার সংস্কার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা, দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা রক্ষা এবং জনগণের আস্থার জায়গা তৈরি করার পাশাপাশি নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য ত্রয়োদশ সরকার নির্বাচন ছিল এ সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। সরকার গঠনের এক বছরের মাথায় এসে মানুষের এসব প্রত্যাশা কতটা পূরণ হলো সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সিন্ডিকেট ভেঙে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনা, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন, অনিয়ম-দুর্নীতি রোধসহ জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকার খুব একটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। তবে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জুলাই হত্যাযজ্ঞের বিচার এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারকাজ শুরু করাসহ সরকারের কিছু সাফল্য রয়েছে। সর্বোপরি আগামী সংসদ নির্বাচনের সময়ক্ষণ ঘোষণা করায় জনমনে কিছু স্বস্তি এসেছে। সবমিলিয়ে যেসব সংস্কারকাজ হাতে নিয়েছে তার মধ্যে মৌলিক বিষয়গুলো সংস্কারের পাশাপাশি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে পারলে এই সরকারকে মানুষ মনে রাখবে দীর্ঘদিন।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গত বছরের পহেলা জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে আন্দোলনে নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সেই আন্দোলনকে থামাতে বলপ্রয়োগ শুরু করে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার। সরকারের এই নিপীড়ন দেখে রাস্তায় নামতে শুরু করেন সাধারণ মানুষও। একপর্যায়ে সেই আন্দোলন রূপ নেয় গণআন্দোলনে। ৩৬ দিনের সেই আন্দোলনের তোপের মুখে ওই বছরের ৩৬ আগস্ট ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালান তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনে মৃতের সংখ্যা অন্তত ১৪০০। আহত হয়েছেন বিশ হাজারেরও বেশি মানুষ। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো আন্দোলনে এত কম সময়ে এত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

গত ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির দিনে ‘গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে অন্তর্বর্তী সরকার জাতির সামনে জুলাই ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা শেষে জুলাই সনদের খসড়ার কাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

গত ৫ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা দেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে আমি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি পাঠাবো, যাতে নির্বাচন কমিশন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, পরবর্তী রমজানের আগেই, জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে।

পরদিন ৬ আগস্ট, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে নির্বাচন কমিশনে একটি চিঠি পাঠানো হয়, যেখানে আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রমজান শুরু হওয়ার আগেই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে বলা হয়।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, এ চিঠির মাধ্যমে নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে সরকারের অনুরোধ প্রক্রিয়াগতভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, আগামী সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে ঘোষণা করা হবে।

সরকার এরই মধ্যে একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করেছে।

যার মধ্যে রয়েছে- নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন, বিচারব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত সংস্কার কমিশন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন, স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন, শ্রমিক অধিকার সংস্কার কমিশন ও নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন। এসব কমিশন তাদের সুপারিশমালা জমা দিয়েছে এবং সরকার অনেক ক্ষেত্রেই সেই সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে এ বছরের জুন মাসে দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমেছে, যা গত ৩৫ মাসে সর্বনিম্ন। তবে জুলাইয়ে তা বেড়ে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ হয়েছে।

ড. ইউনূস বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের সরকারের প্রতি গভীর আস্থার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে বলে জানান তিনি।

প্রধান উপদেষ্টা জানান, গত ১১ মাসে বৈদেশিক ঋণদাতাদের কাছে ৪ বিলিয়ন ডলার সুদ ও মূলধন পরিশোধ করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর পরেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে।

তাসু/চখ

এই বিভাগের আরও খবর