মধ্যরাতে খুলে দেওয়া হলো কাপ্তাই বাঁধের সব গেট
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মাহমুদ হাসান জানান, হ্রদে পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় ১৬টি স্পিলওয়ের প্রতিটি গেট ৬ ইঞ্চি করে খুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে নিঃসৃত হচ্ছে।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কন্ট্রোল রুমের তথ্যমতে, বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ৫টি ইউনিট দিয়ে কর্ণফুলী নদীতে প্রতি সেকেন্ডে আরও প্রায় ৩২ হাজার কিউসেক পানি ছাড়া হচ্ছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও স্পিলওয়ে মিলিয়ে মোট ৪১ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদী হয়ে বঙ্গোপসাগরে যাচ্ছে।
পানির এই নিঃসরণকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে স্থানীয়রা নিয়মিত পোস্ট দিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছিলেন।
যদিও কাপ্তাই বাঁধের স্পিলওয়ে খোলা প্রতিবছরের স্বাভাবিক ঘটনা, এবারে তা নিয়ে বাড়তি উত্তেজনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসন ও কাপ্তাই বাঁধ কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। তবে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সোমবার বিকালে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র এক ঘোষণায় জানায়, যেকোনো সময় স্পিলওয়ে গেট খুলে পানি ছেড়ে দেওয়া হতে পারে। নদী তীরবর্তী জনগণকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানানো হয়।
রাতে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) এক বার্তায় জানান, সোমবার রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে গেট খুলে পানি ছাড়া হবে। এ সময় তিনি নদী তীরবর্তী মানুষকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানান।
এই প্রসঙ্গে রাঙামাটির বাসিন্দা ও সাংস্কৃতিক সংগঠক সৈকত রঞ্জন চৌধুরী বলেন, “প্রায় প্রতি বছরই কাপ্তাই হ্রদের পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি গেলে বা ছুঁইছুঁই করলেই বাঁধের স্পিলওয়ে খুলে দেওয়া হয়। কর্ণফুলী নদী হয়ে এসব পানি সাগরে যায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই স্পিলওয়ে খোলাকে কেন্দ্র করে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে, যদিও এটি একটি স্বাভাবিক বিষয়।”
তিনি আরও বলেন, “এখন ৬ ইঞ্চি করে গেট খুলে ৯ হাজার কিউসেক পানি ছাড়া হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনেই ছাড় হচ্ছে ৩২ হাজার কিউসেক পানি। স্পিলওয়ের চেয়ে অনেক বেশি পানি নিঃসরণ হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকেই।
“প্রতি বছরই হ্রদের পানি বাড়ে, তখন পর্যটন কেন্দ্র ঝুলন্ত সেতু ডুবে যায়, আবার পানি কমলে তা ভেসে ওঠে। যেসব এলাকায় হ্রদ দখল করে নিচু স্থানে বসতি গড়ে উঠেছে, সেসব জায়গায় পানি ঢুকলে সেটিকে কেউ কেউ বন্যা বা প্লাবন বলে প্রচার করছেন। বাস্তবতা হলো, পানি মানুষের কাছে যায়নি, বরং মানুষ পানির কাছে গিয়েছে।”
১৯৬০ এর দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই উপজেলায় কর্ণফুলী নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করে ৭২৫ বর্গকিলোমিটারের কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টি করা হয়। এই বাঁধের মাধ্যমে দেশের প্রথম এবং একমাত্র জলবিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়।
শুরুতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৮০ মেগাওয়াট, যা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে বর্তমানে ২৩০ মেগাওয়াটে উন্নীত করেছে বাংলাদেশ সরকার।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি মেগাওয়াটে খরচ পড়ে ৪০ পয়সা, যা দেশের অন্যান্য তাপ, কয়লা ও গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী। এ কারণে কাপ্তাই হ্রদে পানি ধরে রেখে সারা বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে চায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-বিপিডিবি।
◑ ফখ|চখ
