chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

একই দিনে নিহত ৩ জন, জুলাই আন্দোলনের দাবানল জ্বলে ওঠে চট্টগ্রামে

জুলাই অভ্যুত্থান শুধু ঢাকার নয়, চট্টগ্রাম ছিল এই বিপ্লবের অন্যতম দুর্গ। ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্টের রায়ে ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল ঘোষণা করলে শুরু হয় কোটা বিরোধী আন্দোলন। যা এক সময় স্ফুলিঙ্গ হয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, পরে তা গণঅভ্যুত্থানের রূপ লাভ করে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে আন্দোলনের প্রথম শুরু হয়েছিলো ছাত্রদের গণজোয়ার। চবির ২৩১২ একরের ক্যাম্পাস পেরিয়ে এই আন্দোলন স্থানান্তরিত হয় বন্দরনগরী চট্টগ্রাম শহরে। শুরু হয় শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচী, সড়কপথ, রেলপথ অবরোধ।

নগরীর নিউমার্কেট, আদালত পাড়া, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, ষোলশহরে দিনভর চলে মিছিল, সমাবেশ হামলা আর সংঘর্ষ। হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতার প্রতিবাদ মিছিলে অচল হয়ে পড়ে রাজপথ। কোটা সংস্কার আন্দোলন পরিণত হয় স্বৈরাচার সরকার পতনের আন্দোলনে।

১৬ জুলাই ২০২৪, বিকাল সাড়ে তিনটা থেকে পাঁচটার মধ্যে নগরের ষোলশহর, দুই নম্বর গেইট, মুরাদপুর, শুলকবহর এবং চট্টগ্রাম কলেজ এলাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যুবলীগ-ছাত্রলীগের তুমুল সংঘর্ষে তিনজন শহীদ হন। তারা হলেন মো. ফারুক (৩২), মো. ওয়াসিম আকরাম (২২) এবং ফয়সাল আহমেদ শান্ত (২৪)। এর মধ্যে ফারুক স্থানীয় একটি ফার্নিচার দোকানের কর্মচারী এবং কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মো. দুলালের ছেলে। ওয়াসিম আকরাম চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ও কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনি কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মেহেরনামা গ্রামের শফিউল আলমের ছেলে। ফয়সাল আহমেদ শান্ত চট্টগ্রামের ওমরগণি এমইএস কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র। সেদিন, গুলিবিদ্ধ ৩০ জনসহ আহত হন অন্তত দুই শতাধিক শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণ।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক(সাবেক) চৌধুরী সিয়াম ইলাহী বলেন, ‘আমাদের জুলাই আন্দোলনের প্রতিদিনের কার্যক্রম চট্টগ্রামে যে সমন্বয়ক প্যানেল ছিল সবার সম্মতিক্রমে আগেরদিন অনলাইন মিটিং হতো, সেখানে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। আমি যেহেতু আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলাম, সেদিন সকাল ১০ টা নাগাদ কুমিরা এলাকায় আমরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং রেলপথ অবরোধ করি। ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা অবরোধ করে আমরা একটা বৃহত্তর প্রতিরোধ গড়ে তুলি। এসময় আমাদের উপর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন এবং পুলিশ দফায় দফায় হামলা চালায়, আমরাও পাল্টা ধাওয়া করি। পরে সেখানে কর্মসূচি শেষ করে আমরা বিকাল ৪টা নাগাদ নগরীর দুই নম্বর গেইটে এসে পৌছাই।

নগরীর দুই নম্বর গেইট এলাকা তখন এক প্রকার রণক্ষেত্রে পরিণত হয়, পুলিশ এবং ছাত্রলীগ আমাদের ভাইদের উপর নরপিশাচের মতো হামলা চালায়। আমরা তখন বিভিন্ন জায়গায় ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছিলাম, প্রথম দফায় আমাদের কানে খবর আসে সহযোদ্ধা ওয়াসিম ভাই শহীদ হয়েছেন। তার খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের ফয়সাল আহমেদ শান্ত ভাই শহীদ হন। এবং আরও কিছুক্ষণ পর মুরাদপুরের একজন শ্রমিক ফারুক ভাই শহীদ হন। আমাদের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীর একটা অংশ তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে যাই। কর্মসূচি সফল করে যখন বাসায় ফিরি তখনই ক্লিয়ার হই আজকে পুরো সময় জুড়ে কতজন শহীদ হল।’

বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক(সাবেক) ফাহিম বলেন, ‘আন্দোলনের সবচেয়ে ভয়াবহ কয়েকটি দিন ছিল।তার মধ্যে একটি চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিং এ মার্চ ফর জাস্টিস। সেসময় আমি ও আমাদের একটা টিম সকাল ছয়টায় অবস্থান করি পূর্বের মিটিং এর সাপেক্ষে। সকাল ৯ টা নাগাদ আল বুখারী হোটেলের সামনে থেকে আমাদের কয়েকজন সহযোদ্ধা বোনদেরকে ধরে নিয়ে যায়। সেই সময় আমিসহ কয়েকজন গোয়েন্দা নজরদারিতে পড়ি। তখনো মিছিল শুরু হয়নি, ছিলনা কোন ধরনের মিছিল বের করার তৎপরতা। সেসময় কিএমটি গ্রুপে বাইরে মেসেজ পাঠানো হয় লালদীঘিতে জড়ো হবার। আমরা সহ কয়েকজন জড়ো হই। আইনজীবী তখন মাত্র ৫ জন। তখনো ভাবতে পারছি না কি হবে। পরবর্তীতে লালদীঘি জমায়েত হওয়া ছাত্র-ছাত্রীরা সাহস পায় সেই ছোট মিছিল যখন নামে। এভাবেই সৃষ্টি হয় March For Justice
‘আন্দোলনের রাজপথে থাকাকালীন জীবনের মায়া কাজ করতো কিনা?’ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দৈনিক চট্টলার খবরকে বলেন, ‘কখনো জীবনের মায়া কাজ করেনি, আবার কখনো অবচেতন মনে বাবা-মার কথা মনে পড়ত। যেদিন প্রথম ছাত্রলীগের গুন্ডারা ষোল শহরে হামলা করে, সেদিন বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সোশ্যাল মিডিয়া একটা পোস্ট লিখেছিলাম “যদি পরাজিত হই,আমার লাশটি যেন ফিরে আনা হয়, পরাজিত কফিন যেন ঘরে নিয়ে আসা না হয়…”

তিনি বলেন, ‘যখন আবু সাঈদ সহ নিরীহ জনগণের উপর বর্বরোচিত হত্যা চালানো হয় তখন বিবেকের তাড়নায় বসে থাকা পসিবল ছিল না তখন এক দফা এক দাবি ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য।’
চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ছাত্রজনতার রক্তভেজা আত্মত্যাগের ফলে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। নিউমার্কেট চত্বর, মুরাদপুরের ফ্লাইওভার, ষোলশহরের রেলওয়ে স্টেশন কিংবা আদালতের লাল ভবন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের।

ফখ|চখ

এই বিভাগের আরও খবর