ফিরে দেখা ৪ ও ৫ আগষ্ট
গুলি আর ছাত্রদের রক্তে রাঙ্গা ছিল চট্টগ্রাম নগর
ঘটনা প্রবাহের শুরু জুলাইয়ের শেষাংশে। দেশব্যাপী কোটা সংস্কার আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী-ছাত্রলীগের নিয়মবহির্ভূত পেশিশক্তি প্রদর্শনের ফলে চট্টগ্রামে তীব্র রূপ ধারণ করে ছাত্র-জনতার আন্দোলন। দীর্ঘ এক মাস যাবত চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলন মোড় ঘুরে পরিণত হয় সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ৪ আগস্ট সকাল ১০টায় সমন্বয়কারীদের পূর্ব ঘোষণার ভিত্তিতে নগরের নিউ মার্কেট এলাকায় সকাল থেকেই জড়ো হতে শুরু করেন বিভিন্ন স্কুল-কলেজের হাজার হাজার শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।
তবে বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। দুপুর ১২টায় বিভিন্ন দিক থেকে একযোগে হামলা করে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দেয় পুলিশ। পুলিশের ছোড়া টিয়ার শেল, কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেটে কিছুটা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান আন্দোলনকারীরা। ওই সময়েই রেলওয়ে স্টেশন, কোতোয়ালী মোড় ও সদরঘাট থানার দিক থেকে রামদা, চাইনিজ কুড়ালসহ ধারালো ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা শুরু করে আওয়ামী ক্যাডাররা।
যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপ আ জ ম নাছিরের নির্দেশে মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল এবং হেলাল আকবর বাবরের নেতৃত্বে শহীদ মিনারের দিক থেকে রাইফেল ক্লাবের সামনে আসে। পরবর্তীতে তারা ছাত্রদের ওপর গুলি চালাতে চালাতে আমতল মোড়ে অবস্থান নেয়। এসময় তারা মুহুর্মুহু ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় এবং বহু শিক্ষার্থীকে মারধর করে। এসময় কোনো পুলিশ সদস্যই সেখানে ছিল না। বলা চলে, ছাত্রদের ওপর হামলা করতে আওয়ামী লীগকে উসকে দিয়ে সরে পড়ে পুলিশ।
দুপুর দেড়টার দিকে ওয়াসা মোড়ের দিকে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দেয় ছাত্রলীগ-যুবলীগ। এ সময় দু’পক্ষের কয়েকবার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ বাঁধে। পরে সেনাবাহিনীর একটি দল সংঘর্ষে জড়ানো দুই গ্রুপের মাঝে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে। এতে শিক্ষার্থীরা ওয়াসা মোড়ে এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা কাজীর দেউড়ি মোড়ে অবস্থান নেন।
আন্দোলন দমাতে এক পর্যায়ে অস্ত্রসহ মাঠে নামে আওয়ামী লীগের সকল অঙ্গ সংগঠন। ইসলামিয়া কলেজ ও সিটি কলেজ থেকে ছাত্রলীগ এসে নিউ মার্কেটে অবস্থান নেয়। সেদিন বিকাল ৪টা পর্যন্ত থেমে থেমে নিউ মার্কেটসংলগ্ন ছোটপুল এলাকায় ছাত্র-জনতার সঙ্গে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে।
যুবলীগ নেতা শীর্ষ সন্ত্রাসী হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, ছাত্রলীগের নুরুল আজিম রনি ও তাদের বাহিনীর সন্ত্রাসীরা ছাত্রদের লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি ছোড়ে। এতে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়।
জুলাই ঐক্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সদস্য আবরার হাসান রিয়াদ দৈনিক চট্টলার খবরকে বলেন, “৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি শুরু হয়। ৪ আগস্টের চট্টগ্রামের আন্দোলন ঘোষণা করা হয় নিউ মার্কেট বিকাল ৩টায়, কিন্তু তার এক ঘণ্টা পর আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠন একযোগে ঘোষণা দেয়, তারা ২টায় সমাবেশ করবে নিউ মার্কেট এলাকায়। ফলশ্রুতিতে, পুরো চট্টগ্রামে উত্তেজনা বিরাজ করে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং তাদের অভ্যন্তরীণ গ্রুপ থেকে তথ্য এসেছিল যে, আওয়ামী লীগের নেতারা ওইদিন সর্বোচ্চ সশস্ত্র প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামার নির্দেশনা দিয়েছে। অনেকেই ৪ আগস্টকে তাদের অস্তিত্বের শেষ লড়াই হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে আমরা পরামর্শ করে আন্দোলন সকাল ১১টায় ঘোষণা করি। পরবর্তীতে তারাও সকাল ১১টায় সমাবেশ করার ঘোষণা দেয়। তখন আমরা ঘোষণা না দিয়েই ১০টায় নিউ মার্কেটে জড়ো হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। এই দিনটিকে আমরা ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে জীবন-মরণ লড়াই হিসেবে গ্রহণ করি। যার ফলশ্রুতিতে পরের দিনই পালাতে বাধ্য হয় ফ্যাসিস্ট হাসিনা।”
আওয়ামী লীগের প্রাণপণ লড়াই
মূলত ৪ আগস্ট রাজপথে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগ, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সেদিন শিক্ষার্থীদের একটি মিছিল নগরীর জামালখান মোড় থেকে কাজীর দেউড়ি মোড়ের দিকে যাওয়ার পথে হামলা করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ওই হামলার নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের জামালখান ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন। সেখান থেকে মুহুর্মুহু গুলি করা হয় শিক্ষার্থীদের ওপর।
এই সংঘাত-সহিংসতায় সাংবাদিক ও চার পুলিশ সদস্যসহ সেদিন আহত হন অন্তত ২৬৩ জন।
◑ ফখ|চখ
