চট্টগ্রামে জ্বর,সর্দি কাশি-ব্যাথাতে কাহিল মানুষ
বেশ কিছু দিন ধরেই চট্টগ্রামের হাসপাতাল-ক্লিনিক এবং চেম্বারগুলোয় জ্বর, সর্দি-কাশি, শরীর,গলা ও মাথাব্যথা নিয়ে রোগীদের ভিড় বেড়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্কও বেড়েছে।
চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উপসর্গগুলোর জন্য ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস দায়ী, যা প্রতি বছর নির্দিষ্ট মৌসুমে হঠাৎ করে সংক্রমণের হার বাড়িয়ে তোলে। করোনা-পরবর্তী বাস্তবতায় মানুষ ভাইরাল সংক্রমণ নিয়ে আরও বেশি সচেতন হয়ে উঠেছে, যার ফলে পরীক্ষা, চিকিৎসা ও হাসপাতালে আসার হারও আগের তুলনায় বেড়েছে বলেও মনে করছেন তারা।
দেশে ঋতু পরিবর্তনের সময়গুলোকে ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চলতি বছরও সেই অনুযায়ীর ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ শুরু হয়েছে এবং তুলনামূলক বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন।
অনেকে করোনার মতো উপসর্গ দেখে আতঙ্কে পড়ে যাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ নিজে থেকেই অ্যান্টিবায়োটিক ও ওষুধ খাচ্ছেন, যা বিপজ্জনক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভাইরাল সংক্রমণ স্বল্প সময়ে নিরাময়যোগ্য হলেও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা না নিলে জটিলতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
হাসপাতালে রোগীর চাপ
তিন দিন ধরে জ্বরে ভুগছে লাইলী বেগমের সাত বছরের মেয়ে। প্রথমে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে সাধারণ ওষুধ কিনে খাওয়ালে কোনো উন্নতি না হওয়ায় মেয়েকে নিয়ে আসেন মগবাজারের কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসক ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে বলেন।
লাইলী বেগম বলেন, “মেয়েটা খুব দুর্বল হয়ে গেছে। মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা বলছে। জ্বরটা বারবার উঠছে, নামছে। হাসপাতালে নিয়ে আসছি কিন্তু এখনও জানি না ডেঙ্গু কি না। খুব চিন্তায় আছি। বাসার পাশে অনেক জায়গায় মশা, পরিষ্কারও ঠিকমতো হয় না।
”একই অবস্থা মো. কামরুজ্জামানের। তিনি নিজেই এসেছেন হাসপাতালে। গত চার দিন ধরে জ্বর, শরীর ব্যথা, গলা ব্যথা এবং দুর্বলতায় তিনি প্রায় অচল হয়ে পড়েছিলেন। স্থানীয় ডাক্তারের পরামর্শে ডেঙ্গু টেস্ট করিয়েছেন এবং সেটি নেগেটিভ এসেছে। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, তিনি সিজনাল ফ্লুতে আক্রান্ত।
কামরুজ্জামান বলেন, “প্রথমে ভেবেছিলাম ডেঙ্গুই হবে। টেস্ট করালাম, রিপোর্টে নেগেটিভ। পরে ডাক্তার বললেন এটা সিজনাল ভাইরাল ফ্লু। কিন্তু শরীরটা একেবারে ভেঙে পড়েছে। ডাক্তার বলেছে বিশ্রাম আর তরল খাবার দরকার।
”স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত মার্চ থেকে জুন এবং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই দুই সময়কাল ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। এই সময়টায় প্রতি বছর ইনফ্লুয়েঞ্জা সংক্রমণ বাড়ে। হাসপাতালগুলোতেও এর বাস্তবতা লক্ষণীয়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত সপ্তাহের শুরুর তিনদিনে বহির্বিভাগে রোগী এসেছে দুই হাজারের বেশি। যাদের বেশিরভাগই জ্বর সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত। ডেঙ্গু ও অন্যান্য রোগী মিলেয়ে হাসপাতালে কোনো শয্যা খালি নেই। একই অবস্থা অন্য সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে।
আইসোলেশন সেন্টার চালু
বন্দরনগরীতে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ১২৩ ছাড়িয়ে গেল। সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় আইসোলেশন সেন্টার চালু করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি আবারও সংক্রমণ শুরুর পর এ নিয়ে চট্টগ্রামে ১১২ জন করোনায় আক্রান্ত হলেন। আর মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের।
এদিকে নগরীর আলকরণ এলাকায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জেনারেল হাসপাতালের (মেমন হাসপাতাল-২) তৃতীয় তলায় ১৫ শয্যার করোনা আইসোলেশন সেন্টার ও রেপিড এন্টিজেন টেস্ট কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আইসোলেশন সেন্টারের উদ্বোধন করেন।
চসিক মেয়র যা বললেন
চসিক মেয়র জানান, ১৫ শয্যার আইসোলেশন সেন্টারের ১০টি পুরুষ এবং ৫টি মহিলা রোগীর জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আরও ৫টি শয্যা চালু করা হবে। এখানে জরুরি চিকিৎসা সেবার জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার, চিকিৎসক, নার্স এবং সেবাদানকারী কর্মী রাখা হয়েছে। এছাড়া রোগীদের প্রাথমিক অবস্থায় রেপিড এন্টিজেন টেস্ট করা প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
করোনা মোকাবেলায় জনসচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মেয়র বলেন, ‘করোনা এখন আবার ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ইতোমধ্যে ১২৩ জনেরও বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। জ্বর বা কাশি ছাড়াই অনেকের শ্বাসকষ্ট দেখা দিচ্ছে। আমরা চাই, কেউ উপসর্গ অনুভব করলে দ্রুত পরীক্ষা করুক, প্রয়োজনে এই সেন্টারে এসে আইসোলেশনে থাকুক। এখান থেকে গুরুতর রোগীদের ভেন্টিলেটর সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালে নেয়া হবে।
প্রতিবছর কত মানুষ ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়?
আইইডিসিআর এবং নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৪ সালে যৌথভাবে ‘ঋতুভিত্তিক ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি গবেষণা পরিচালনা করে। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অনুরূপ উপসর্গ নিয়ে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। বছরে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার রোগী ইনফ্লুয়েঞ্জা সম্পর্কিত জটিলতায় হাসপাতালে ভর্তি হন।
গবেষণায় পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর (শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক, সহস্রোগী ব্যক্তি ও স্বাস্থ্যকর্মী) ওপর ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকার উপকারিতা পরিমাপ করা হয়। দেখা যায়, গর্ভবতীদের ক্ষেত্রে টিকা অত্যন্ত কার্যকর ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। গবেষণাটি পরামর্শ দেয়, জাতীয় পর্যায়ে সিজনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা কর্মসূচি চালু করা গেলে গুরুতর অসুস্থতা ও স্বাস্থ্য ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ
এমিরেটাস অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, “ঘরে ঘরে সর্দি-কাশি জ্বর, গলাব্যাথা হচ্ছে। এগুলো ভাইরাসজনিত সমস্যা। এটি আবহাওয়ার সাথে সম্পর্কিত। থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।”
করনীয় কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ভাইরাস জ্বরের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। কেউ আক্রান্ত হলে যথাসম্ভব ঘরে থাকবে। তারা বের হবে না। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবে। এ সমস্যার বিশেষ কোনো চিকিৎসা নেই। সাধারণ প্যারাসিটামল খাবে অথবা চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ গ্রহণ করবে।
”ডেঙ্গুর মৌসুম হওয়ায় পরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “যাদেরেই এমন হবে তারা যেন ডেঙ্গু পরীক্ষাটা করিয়ে নেয়। যত দ্রুত শনাক্ত হবে ততো দ্রুত চিকিৎসা হবে। অনেকে গুরুত্ব না দিয়ে দেরিতে হাসপাতালে আসে। এতে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।”
