এইল্লে গরম আর ন দ্যাই
“মাথাত পানি দি আজিয়ে পাঁচবার। গোসল গরগি দুইবার। রাতিয়ে আরও একবার গরন ফরিবো। ঘাম বার ঐযার শরীলেই (শরীর) শুকায়। গোসল গরিয়েরেও শরীলের গরম ন যার। এইল্লে গরম আর ন দ্যাই। এই গরমত মানুষ বাঁচে? অ্যার জীবনত মনে হয় এ্যান গরম আর ন দ্যাই আপা।
চট্টগ্রামের ভাষায় এমন কথাগুলো বলেছিলেন মুরাদপুরের রিকশা চালক রহিম আলী।
চট্টগ্রামে টানা তাপপ্রবাহে জনজীবনে হাঁসফাঁস অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তীব্র গরমে ঘরের বাইরে যেমন স্বস্তি মিলছে না, তেমনই বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে ঘরেও টেকা যাচ্ছে না। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। এ খরতাপ থেকে শিক্ষার্থী থেকে দিনমজুর, গাড়ির চালক, যাত্রী, ফেরিওয়ালা, চাকরিজীবী কেউই রক্ষা পাচ্ছেন না।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছুঁয়েছে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা শরীরে ৪১ ডিগ্রি বা তারও বেশি অনুভূত হচ্ছে। আগামী কয়েকদিন এই গরম অব্যাহত থাকতে পারে, কিছু এলাকায় সামান্য বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে তাও মাত্র ৪ শতাংশ।
সরেজমিন নগরের বিভিন্ন মোড়ে দেখা গেছে— মানুষ পানির বোতল হাতে রিকশা বা বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন, কারও মাথায় কাপড় বা গামছা পেঁচানো। সকাল ১০টা থেকে রাস্তায় বের হলেই যেন মাথার ওপরে এক টুকরো আগুন। বেলা গড়াতেই যেন ব্যস্ত নগরের আগ্রাবাদ, জিইসি মোড়, নিউ মার্কেট বা বহদ্দারহাটে দুপুরের দিকে মানুষের চলাচল কমে আসে অনেকটাই।
নগরীর আন্দরকিল্লা মোড়ের ফল বিক্রেতা আজাদ রহমান মাথায় গামছা বেঁধে ফল বিক্রি করছিলেন। একটু পরপর তিনি গামছাটি দিয়ে ঘাড় ও মুখ মুছছিলেন। মাঝে মাঝে গামছা দিয়ে হাত পাখার মতো বাতাস করছিলেন। তিনি বলেন, কিছুই করার নেই। গরম সহ্য করতে হচ্ছে। আমার ইনকাম দিয়েই সংসার চলে। বেচা–বিক্রি না করলে তো হবে না।
তিনি বলেন, স্বাভাবিকের চেয়ে ক্রেতার সংখ্যাও কমে গেছে। গরমের কারণে এটি হয়েছে। মানুষ ঘর থেকে কম বের হচ্ছেন। গতকাল নগরীতে রাজনৈতিক দলের সমাবেশ ছিল। এর জেরে নগরজুড়ে যানজটও ছিল। অনেক যাত্রীকে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। অনেকে দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থেকেও গাড়ি পাননি। দুপুর আড়াইটার দিকে কাজীর দেউড়ি মোড়ে দাঁড়িয়েছিলেন হোসেন মিয়া নামে এক ব্যক্তি। তিনি সিএনজি টেক্সি খুঁজছিলেন। যাবেন চান্দগাঁওয়ের রাস্তার মাথা এলাকায়।
তিনি আরও বলেন, ১৫ মিনিটের মতো হবে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু কোন গাড়ি পাচ্ছি না। অন্তত বহদ্দারহাট মোড় পর্যন্ত যদি যেতে পারতাম! সেখান থেকে অন্য একটি গাড়ি নিয়ে বাসায় চলে যেতাম। কোনো লোকাল গাড়িও দাঁড়াচ্ছে না। যাত্রীর চাপ অনেক। আগ্রাবাদ থেকে যেসব টেম্পো আসছে সেগুলো দাঁড়াচ্ছে না।
এ সময় আগ্রাবাদ মোড়ে কথা হয় রিকশাচালক জালাল মিয়ার সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘এই গরমে প্যাডেল মারা যায় না। গায়ে পানি ঢেলে বের হই, মনে হয় মিনিট খানেকেই আবার শুকায়। একবার ভাড়া মারার পর যেন রত-হাত আর চলে না। ঠিকমতো ভাড়া মারতে পারতেছি না দেখে ইনকামও কমে গেছে।’
অন্যদিকে, সকাল থেকে সূর্যের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিকসহ খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। এক নির্মাণশ্রমিক রফিক মিয়া বলেন, ‘সিমেন্টের গরম মিশ্রণে কাজ করতে গিয়া মনে হয় শরীরই পুড়ে যাচ্ছে। কি আর করা উপায় তো নাই। আমরা খেটে খাওয়া মানুষ, গরম হোক আর যাই হোক কাজ না করলে ভাত জুটবে না।’
চকবাজার এলাকার বাসিন্দা নুর নবী বলেন, তীব্র তাপদাহে ঘরেও থাকা যাচ্ছে না। দুপুরের দিকে একটু ঘুমাচ্ছিলাম। ফ্যান চলছিল। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে। দেখি শরীর ঘেমে গেছে। গায়ে থাকা টি–শার্টও ভিজে গেছে। বাধ্য হয়ে উঠে পড়লাম। তিনি বলেন, একটু বের হব ভাবছিলাম। সদরঘাটে কাজ ছিল। কিন্তু বের হতে ইচ্ছে করছিল না।
ইস্পাহানী মোড়ে বাস চালক রহমত উল্লাহ জানান, বাজে অবস্থা। যানজট রয়েছে। এর মধ্যে প্রচুর গরম। যাত্রীরা চেঁচামেচি করছেন। একজনের গায়ে আরেকজন লাগলেই রেগে যাচ্ছেন। আমার সহকারীর সাথেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মেজাজ দেখাচ্ছেন যাত্রীরা। আমরাও মেজাজ ঠিক রাখতে পারছি না। এভাবেই চলছে। আসলে গরমে মানুষ অতিষ্ঠ।
এদিকে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে হিটস্ট্রোক ও পানিশূন্যতায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল সূত্র।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গত তিনদিন ধরে প্রতিদিনই হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও মাথা ঘোরার সমস্যা নিয়ে গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন রোগী আসছেন। যাদের মধ্যে নিম্নআয়ের মানুষ বা শ্রমিকের সংখ্যাই বেশি।’
আবহাওয়াবিদদের মতে, পশ্চিমাঞ্চল থেকে আসা গরম বাতাস এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। এছাড়া বাতাসে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার কারণে তাপপ্রবাহের অনুভূতি আরও তীব্র হচ্ছে। বর্তমানে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ চলছে, যা আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
চট্টগ্রামবাসীকে কয়েকদিন সতর্ক থাকতে হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থায় সরাসরি সূর্যের আলো এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত পানি পান করা, হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান এবং শিশু ও বৃদ্ধদের বিশেষ যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। বিশেষ করে দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত রোদে যাওয়া যাবে না। জরুরি কাজে বাইরে যেতে হলে ছাতা ব্যবহার করতে হবে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ছায়াযুক্ত স্থানে বিশ্রাম নিতে হবে। সম্ভব হলে মাঝে মাঝে চোখে–মুখে পানির ঝাপটা দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত রোদের মাঝে বেশি সময় ধরে শারীরিক পরিশ্রমী কাজ ও খেলাধুলা থেকে বিরত থাকতে হবে। সহজে হজম হয় এমন খাবার খাওয়া, অসুস্থ বোধ করলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা, তাপপ্রবাহ চলাকালীন শিশু, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, শ্রমজীবী ও শারীরিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিদের প্রতি লক্ষ্য রাখারও পরামর্শ দেন তারা।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস কর্মকর্তা মো. ইসমাইল ভূঁইয়া বলেন, চট্টগ্রামে দুদিন ধরে মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি। গতকাল শনিবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ২৮ দশমিক ২ ডিগ্রি। চট্টগ্রাম অঞ্চলে মে মাসে সাধারণত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকে। দুদিন ধরে সেই মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি আরও তিন দিন চলতে পারে।
তিনি বলেন, ১২ মে’র পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়তে পারে। তখন গরম থাকলেও এ ধরনের অসহনীয় পরিস্থিতি কিছুটা কমবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, ৩৬ ডিগ্রি থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে মৃদু তাপপ্রবাহ, ৩৮ ডিগ্রি থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে মাঝারি তাপপ্রবাহ, ৪০ ডিগ্রি থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং ৪২ ডিগ্রি ও এর উপরের তাপমাত্রাকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চলতি মৌসুমে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায়। গতকাল এ জেলায় তাপমাত্রার পারদ ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়।
◑ মআ|ফখ| চখ
