সুপরিকল্পিতভাবে চট্টগ্রাম নগরীকে ঢেলে সাজাব: মেয়র
চট্টগ্রাম নগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিক ও টেকসই করতে ব্যাপক পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেছেন, নগরীর যানজট নিরসন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হবে।
রোববার টাইগারপাসস্থ চসিক কার্যালয়ে প্রকৌশল বিভাগের সাথে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “নগরীর সার্বিক উন্নয়ন ও পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা ছাড়া অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সম্ভব নয়। যানজট, অপরিকল্পিত রাস্তা এবং অপর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থার কারণে নগরবাসী প্রতিদিন দুর্ভোগে পড়ছে। তাই যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।”
চট্টগ্রাম নগরীর উন্নয়নে যুগোপযোগী ও টেকসই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মেয়র প্রকৌশল বিভাগের সাথে প্রতি সপ্তাহে অগ্রগতি সভা আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন। নগরবাসীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য এই সভাগুলো নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, “নগরীর উন্নয়ন কাজ দ্রুত ও মানসম্মতভাবে সম্পন্ন করতে হলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় প্রয়োজন। এই কারণেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, প্রতি সপ্তাহে প্রকৌশল বিভাগের সাথে নগরীর উন্নয়ন কাজের অগ্রগতি বিষয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে উন্নয়ন কার্যক্রমে গতিশীলতা আসবে এবং কাজের মানও বৃদ্ধি পাবে।”
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “চট্টগ্রাম দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। কিন্তু এখনো অনেক সড়কের বেহাল দশা। সড়ক উন্নয়নে মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করতে হবে যাতে রাস্তা দীর্ঘস্থায়ী হয়। শুধু নির্মাণ করলেই হবে না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণেরও ব্যবস্থা রাখতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “নগরীর ব্যস্ততম এলাকাগুলোর সড়ক প্রশস্ত করতে হবে এবং যান চলাচলের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক কেন্দ্র, পর্যটন এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অঞ্চলের সড়ক উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।”
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “নগরীর সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে। লেন মার্কিং, জেব্রা ক্রসিং ও ফুট ওভারব্রিজ নিশ্চিত করতে হবে। আধুনিক ট্রাফিক সংকেতব্যবস্থা চালু করে তা যেন নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।”
নগরীর যানজট কমাতে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন মেয়র। তিনি বলেন, “শহরের বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ পার্কিং এবং রাস্তার পাশে অবৈধ দোকান-পাটের কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।”
সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত ফুটপাত ও ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের ওপর জোর দেন মেয়র। তিনি বলেন, “পথচারীদের জন্য আলাদা ফুটপাত ও ফুট ওভারব্রিজের ব্যবস্থা করতে হবে। সড়ক পারাপারে যাতে সাধারণ জনগণ নিরাপদ থাকে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। স্কুল, কলেজ ও হাসপাতালের সামনে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং জেব্রা ক্রসিংয়ের সংখ্যা বাড়াতে হবে।”
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “নগরবাসীর যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত করতে হলে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু রাস্তা প্রশস্ত করলেই হবে না, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি। আমরা যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে চট্টগ্রামকে একটি আধুনিক, নিরাপদ ও যানজটমুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, “যানজট, রাস্তাঘাটের দুরবস্থা এবং অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার কারণে চট্টগ্রামবাসী প্রতিদিন নানা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এই অবস্থার পরিবর্তন আনতে হলে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।” মেয়রের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “নগরীর বাণিজ্যিক, পর্যটন, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার সর্বোচ্চ প্রাধান্য পাবে। এতে নাগরিকদের যাতায়াত সহজ হবে এবং নগরীর সার্বিক আর্থিক কর্মকাণ্ডের উন্নতি হবে।”
চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্যবর্ধন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আলোকায়ন ব্যবস্থা উন্নত করার নির্দেশ দেন মেয়র। তিনি বলেন, “নগরীর বিভিন্ন এলাকায় যেখানে পর্যাপ্ত আলোর অভাব রয়েছে, সেখানে পর্যাপ্ত স্ট্রিটলাইট ও এলইডি বাতি স্থাপন করতে হবে। বিশেষ করে ফ্লাইওভার, ব্যস্ত সড়ক, আবাসিক এলাকা, পার্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করতে হবে। শহরের আলোকায়ন ব্যবস্থা আধুনিক করতে হলে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে। এতে বিদ্যুতের ব্যয় কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই আলোকসজ্জার ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে।”
চট্টগ্রাম শহরের অন্যতম বড় সমস্যা হলো জলাবদ্ধতা। বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়, যার ফলে নাগরিক দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে। এই সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন মেয়র। তিনি বলেন, “নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করতে কার্যকর ড্রেনেজ সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। যেসব এলাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যা বেশি, সেসব এলাকায় নতুন ড্রেন নির্মাণ করতে হবে এবং পুরনো ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। বর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা সঠিকভাবে করতে না পারলে নগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যা দূর হবে না। তাই ড্রেন পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্নতার কাজ নিয়মিত করতে হবে।”
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত অর্থের প্রয়োজন। এই কারণে নগর ভবনের নির্দিষ্ট অংশকে আয়বর্ধক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার পরিকল্পনার কথা জানান মেয়র। তিনি বলেন, “নগর ভবনের একটি অংশ বিভিন্ন ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া প্রদানের মাধ্যমে এটি চসিকের জন্য একটি আয়ের উৎস হিসেবে গড়ে তোলা হবে। চসিকের নিজস্ব আয় বাড়ানোর বিকল্প কোনো পথ নেই। সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে আমাদের নিজেদের আয়ের উৎস তৈরি করতে হবে। নগর ভবন থেকে অর্থ উপার্জনের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চসিকের উন্নয়ন কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।”
নগরীতে যানজট ও দুর্ঘটনা কমানোর জন্য নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, “সড়ক নিরাপত্তার জন্য লেন মার্কিং, জেব্রা ক্রসিং ও ফুট ওভারব্রিজ স্থাপন করতে হবে। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে জেব্রা ক্রসিং নিশ্চিত করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা নিরাপদে রাস্তা পার হতে পারে।”
এই মতবিনিময় সভায় চসিকের প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফরহাদুল আলম, জসিম উদ্দিন, নির্বাহী প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম, আনোয়ার জাহান, রিফাতুল করিম, তাসমিয়া তাহসিন, মাহমুদ শাফকাত আমিন, শাফকাত বিন আমিনসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। সভায় উপস্থিত প্রকৌশলীরা মেয়রের নির্দেশনা অনুযায়ী নগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
◑ ফখ|চখ
