chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

কর্ণফুলী নদীতে শতাধিক ড্রেজার দিয়ে বালু হরিলুট

চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলী নদী। এ নদী ঘিরে চট্টগ্রামের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার। চট্টগ্রামের লাইফ লাইন খ্যাত এ নদীটি অবৈধ দখল ও অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে তীরবর্তী এলাকা ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। সম্প্রতি নদীটির নগরের বাংলা বাজারঘাট থেকে রাঙ্গুনিয়া পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে অবৈধভাবে শতাধিক ড্রেজার দিয়ে বালু হরিলুট করা হচ্ছে।

খবর নিয়ে জানা গেছে, বাকলিয়ার নতুন ব্রিজ থেকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কাপ্তাই পর্যন্ত নদীর দুপাড়ে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক বৈধ-অবৈধ বালুর মহাল। দিন-রাত নদীর বুকে দাপড়ে বেড়াচ্ছে বালু বহনকারী বোট ও ড্রেজার মেশিন। দৈনিক ৮০টি ড্রেজার মেশিনে ৪৫/৫০ লাখ ঘনফুট বালু তোলা হচ্ছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, এতে নদীর পাশাপাশি জীব বৈচিত্র্য সংকটের মুখে পড়ছে। নদীর দু’পাশ ভাঙ্গনের কবলে পড়ছে।
জানতে চাইলে পরিবেশবিদ ও কর্ণফুলী নদী বিশেষজ্ঞ ড. ইদ্রিস আলী বলেন, কর্ণফুলী নদীতে বিচ্ছিন্নভাবে মাটি বালু উত্তোলনের ফলে নদীতে সেডিমেন্টেশন হচ্ছে এবং নদীর বাস্তুতান্ত্রিকতাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, বালু উত্তোলন অত্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে ও সুপরিকল্পিতভাবে হতে হয়। বর্তমানে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে তার লেশমাত্র নেই। না থাকাটাই নদীর জন্য, নদী টিকে থাকার জন্য বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কে শোনে কার কথা?
কর্ণফুলী নদীর রাঙ্গুনিয়া অংশে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। এতে নদী ভাঙ্গনের আশঙ্কা করছেন পাশ্ববর্তী এলাকাবাসী। দীর্ঘ দিন ধরে অবৈধ বালু বাণিজ্য চললেও রহস্যজনক কারণে স্থানীয় প্রশাসন নীরব। ছবি – এম. ফয়সাল এলাহী

 

অভিযোগ রয়েছে, অবৈধভাবে বালু তুলে চট্টগ্রাম মহানগরীসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাচার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র। অন্যদিকে ইজারা না দেয়ায় সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ নিয়মনীতি অনুসরণ না করে বালু তোলায় বেড়েছে কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী এলাকার ভাঙন। ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে নিংস্ব হচ্ছে নদী পাড়ের শত শত মানুষ।

সরেজমিনে দেখা যায়, ইজারাদাররা যত্রতত্র ড্রেজার বসিয়ে অবাধে বালু উত্তোলন করছে। একেকটি ড্রেজার দিয়ে দৈনিক ৩০ থেকে ৫০ হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা যায়।

কে শোনে কার কথা?

কালুরঘাটে বালু বিক্রয়ের সাথে জড়িত আরিফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি বলেন, কালুরঘাট থেকে নতুন ব্রিজ এলাকা পর্যন্ত দেড়শটি বালু মহাল রয়েছে, ৫০টির বেশি ড্রেজার মেশিন রয়েছে। এসব বালু মহালের কোনটি ইজারাপ্রাপ্ত, আবার কোনটি ইজারা ছাড়াই ব্যবসা করছে।

তিনি বলেন, এদের অনেকেরই বালু তোলার ড্রেজার মেশিন নেই। যাদের ড্রেজার আছে তারা সেখান থেকে বালু নিয়ে ব্যবসা করছে। বোটে করে এসব বালু বিভিন্ন জায়গা থেকে নিয়ে এসে নদীর ধারে বালু মহাল গড়ে তোলা হচ্ছে। সেখান থেকে বালু বাইরে বিক্রি হচ্ছে। কর্ণফুলী নদীর নতুন ব্রিজ, কালুরঘাট ও পতেঙ্গা পয়েন্ট থেকে দৈনিক পাঁচ/ছয় লাখ ঘনফুট বালু বিক্রি হয়ে থাকে বলে জানান তিনি। এসব বালু চট্টগ্রামে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন রাস্তাঘাট, ভবনসহ বিভিন্ন নির্মাণ কাজে যাচ্ছে।

চট্টগ্রামে কর্ণফুলী রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন সাংবাদিক আলীউর রহমান। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রাণ এ নদীকে এভাবে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়া যাবে না। এটা করা কোনোভাবেই উচিত না। এভাবে বালু উত্তোলনের ইজারা প্রথা বন্ধ করার পাশাপাশি অবৈধ সকল কার্যক্রম বন্ধ হওয়া উচিত।

কে শোনে কার কথা?

এদিকে রাঙ্গুনিয়ার কোদালা বালুমহাল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখান থেকে ১০/১২টি ইঞ্জিন নৌকায় করে বালু পাচার করা হয়। অব্যাহত বালু উত্তোলনের কারনে গত কয়েক বছরে উপজেলার সরফভাটা ইউপির ভুমিরখীল, মধ্যম সরফভাটা, পাইট্টালীকুল, মীরেরখীল, শিলক খালের তৈলাভাঙা গ্রাম, মরমের মুখ, ফুলতলি গ্রামের অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। গৃহহারা হয়েছে প্রায় দুই শতাধিক মানুষ। এ ছাড়া কর্ণফুলী নদীর দুই তীরে ভাঙনের মুখে রয়েছে প্রায় দুই হাজার পরিবারের বাড়িঘর ও বিস্তীর্ণ ভূমি।

জানা গেছে, বালু মহালের ইজারা পাওয়ার পর ইজারাদারদের কার্যক্রমের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কোনো তদারকি নজরে পড়ে না। এছাড়া একেকটি ব্লক থেকে কত পরিমাণে বালু উত্তোলন করা যাবে, তার কোনো মাপরেখা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি ইজারাদারদের। এতে যে যার মতো করে কর্ণফুলীর বালু লুট করছে।

  • ফখ|চখ
এই বিভাগের আরও খবর