chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

৭৬৯ জাহাজে সাগরে আটকা ১০ লাখ টনের বেশি পণ্য

লাইটারেজ জাহাজ ধর্মঘট

জাহাজ মালিকরা তাদের আটকে থাকা সাড়ে ৬০০ কোটিরও বেশি টাকার ভাড়া পরিশোধ না করায় সারা দেশে ৭৬৯ লাইটারেজ জাহাজ থেকে পণ্য খালাস বন্ধ রেখেছে জাহাজ মালিকরা। তারা তাদের বকেয়া টাকা না পাওয়া পর্যন্ত জাহাজ থেকে কোনো মালামাল খালাস করবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে চট্টগ্রাম ঢাকা খুলনাসহ দেশের নানা অঞ্চলের নদী এবং ঘাটে ১০ লাখ টনেরও বেশি পণ্য বোঝাই ৭৬৯টি লাইটারেজ জাহাজ অলস ভাসতে শুরু করেছে।

সারা দেশে লাইটারেজ জাহাজ থেকে আমদানিকৃত পণ্য খালাস বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন রুটে পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম লাইটারেজ জাহাজের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি) ভেঙ্গে যাওয়ার একদিনের মাথায় লাইটারেজ জাহাজ মালিকরা তাদের পণ্য বোঝাইকৃত জাহাজ থেকে সব ধরনের পণ্য খালাস বন্ধ করে দেন।

গতকাল শুক্রবার ঢাকাস্থ বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিভোয়া) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠক থেকে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এর ফলে চট্টগ্রাম ঢাকা খুলনাসহ দেশের নানা অঞ্চলের নদী এবং ঘাটে ১০ লাখ টনেরও বেশি পণ্য বোঝাই ৭৬৯টি লাইটারেজ জাহাজ অলস ভাসতে শুরু করেছে। ফলে দেশব্যাপী পণ্য পরিবহন নেটওয়ার্ক ভেঙেপড়াসহ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জাহাজ জট সৃষ্টিরও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাপী পানিপথে পণ্য পরিবহন সাশ্রয়ী মাধ্যম। বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্যসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নৌ পথে পরিবহন করা হয়। প্রায় দুই হাজার লাইটারেজ জাহাজ এসব পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত রয়েছে। দেশব্যাপী পণ্য সরবরাহ নেটওয়ার্কের সিংহভাগই অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন খাতের উপর নির্ভরশীল।

চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে পারে না এমন পণ্যবাহী সব মাদার ভ্যাসেলই বহির্নোঙরে অবস্থান নিয়ে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাস করে। আবার বন্দরে ভিড়ে এমন বহু জাহাজও ড্রাফট কমানোর জন্য বহির্নোঙরে পণ্য লাইটারিং করে। বন্দরে ভিড়েও বহু জাহাজ ওভারসাইডে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাস করে থাকে। এসব জাহাজে গড়ে অন্তত আট থেকে ১০ কোটি টন পণ্য হ্যান্ডলিং হয়ে থাকে। চাল, ডাল, গমসহ নানা ভোগ্যপণ্য এবং পাথর, কয়লা ও সারসহ কোটি কোটি টন পণ্য ডব্লিউটিসির নিয়ন্ত্রিত জাহাজের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়ে আসছিল।

চট্টগ্রাম বন্দর এবং বহির্নোঙর থেকে বন্দর চ্যানেলের নানা ঘাট এবং ঢাকা, মিরপুর, নগরবাড়ী, বাঘাবাড়ী, নোয়াপাড়া, খুলনা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব জাহাজ পণ্য পরিবহন করে। চট্টগ্রামস্থ সিইউএফএল এবং কাফকোর উৎপাদিত সারের একটি অংশও বিসিআইসির নিয়ন্ত্রিত বাফার গুদামে পৌঁছানোর জন্য লাইটারেজ জাহাজের উপর নির্ভর করতে হয়।

প্রচলিত নিয়মানুযায়ী ডব্লিউটিসি প্রতিদিনই বার্থিং সভা করে আমদানিকারকদের চাহিদার বিপরীতে লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দেয়। ডব্লিউটিসি দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় করে জাহাজ বরাদ্দ এবং ভাড়া আদায় করে থাকে। এর মধ্যে আমদানিকারকদের প্রতিনিধি হিসেবে পণ্যের এজেন্টগণ ডব্লিউটিসিতে জাহাজের চাহিদা উপস্থাপন করে। অপরদিকে ডব্লিউটিসির তালিকাভুক্ত লোকাল এজেন্টগণ প্রয়োজনীয় জাহাজ উপস্থাপন করে। পণ্যের এজেন্টদের চাহিদা এবং লোকাল এজেন্টদের ভাড়ার জন্য প্রস্তুত জাহাজের মধ্যে সমন্বয় করে ডব্লিউটিসি জাহাজ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। পণ্যের এজেন্টরা আমদানিকারক থেকে ভাড়ার টাকা ডব্লিউটিসিকে প্রদান করে। ডব্লিউটিসি এই টাকা লোকাল এজেন্টের মাধ্যমে জাহাজ মালিককে পরিশোধ করে। ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের অনুমোদিত ৩৩ জন পণ্যের এজেন্ট এবং ৬০ জন লোকাল এজেন্ট রয়েছেন। দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতে দেশব্যাপী পণ্য পরিবহনের পুরোটাই এদের ওপর নির্ভরশীল। আবার অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন খাতের এই কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরশীল চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরের কার্যক্রম থেকে শুরু করে দেশের আমদানি বাণিজ্য। লাইটারেজ জাহাজ চলাচলে কোনো ধরনের সঙ্কট দেখা দিলে পুরো ব্যবস্থাপনায় ধস নামে।

জানা যায়, ডব্লিউটিসি জাহাজ মালিকদের তিনটি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত। এই তিনটি সংগঠনের সদস্যদের মালিকানাধীন জাহাজই ডব্লিউটিসির বহরে চলাচল করে। গত বেশ কিছু দিন যাবত ডব্লিউটিসি নিয়ে জাহাজ পরস্পর বিরোধী অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগ চলে আসছিল। এর মধ্যে জাহাজ মালিকদের সাড়ে ৬০০ কোটিরও বেশি টাকা গুটিকয়েক পণ্যের এজেন্ট আটকে রেখেছে বলেও অভিযোগ উঠে। এই টাকা পরিশোধের সময় বেঁধে দেয়া হলেও তার কোনো সুরাহা হয়নি। এরই মধ্যে ডব্লিউটিসির তিনটি সংগঠনের মধ্যে ইনল্যান্ড ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগাং (আইভোয়াক) ডব্লিউটিসি থেকে বের হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এই সংগঠনের অনেক সদস্যই পণ্যের এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যাদের কাছে সাধারণ জাহাজ মালিকদের কোটি কোটি টাকা আটকা থাকার অভিযোগ করা হচ্ছে। ডব্লিউটিসির পাওনা টাকার ব্যাপারে কোনো সুরাহা হওয়ার আগে আইভোয়াক চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনকে প্রধান করে নতুন সেল করে গত বুধবার থেকে কার্যক্রম শুরু করেছে।

আটকে থাকা টাকার কোনো সুরাহা হওয়ার আগে পণ্যের এজেন্টদের একটি অংশসহ আইভোয়াকের আলাদা সেল করার ঘটনার একদিনের মাথায় বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিভোয়া) নেতারাসহ সাধারণ জাহাজ মালিকরা ঢাকায় জরুরি বৈঠকে বসেন। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিসিভোয়া কার্যালয়ে চলা ওই বৈঠকে কয়েক শ’ জাহাজ মালিক অংশ নেন বলে জানিয়েছেন ডব্লিউটিসির কনভেনর মোহাম্মদ নুরুল হক।

তিনি বলেন, সাধারণ জাহাজ মালিকরা পুরো ব্যাপারটিতে হতভম্ব হয়ে পড়েছেন। জাহাজ মালিকদের সাড়ে ৬০০ কোটিরও বেশি টাকা না দিয়ে আলাদা সেল করে জাহাজ পরিচালনার উদ্যোগ নেয়ায় সাধারণ জাহাজ মালিকরা ক্ষুব্ধ। তারা তাদের টাকা না পাওয়া পর্যন্ত তাদের জাহাজে থাকা কোন মালামাল খালাস করতে দেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। তিনি বলেন, জাহাজ মালিকদের ৬৫২ কোটি ৭০ লাখ ৮০ হাজার ১৭৯ টাকা পণ্যের এজেন্টদের কাছে আটকা পড়ে রয়েছে।

মোহাম্মদ নুরুল হক জানান, জাহাজ মালিকদের বিপুল অঙ্কের টাকা মেরে দেয়ার জন্য বিশৃঙ্খল একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হচ্ছে। আমরা সবাইকে টেবিলে বসে বিষয়টির সুরাহা করার অনুরোধ জানিয়েছি।

সরকারের পক্ষ থেকেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থে একটি চক্র জনমুখী এই খাতে নৈরাজ্য এবং অরাজকতা সৃষ্টি করছে।

ফখ|চখ

এই বিভাগের আরও খবর