chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

৮ মাসে ৩৬৪ শিক্ষার্থীর ‘আত্মহত্যা’

ডেস্ক নিউজ: চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দেশে ৩৬৪ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন।

শুক্রবার (৯  সেপ্টেম্বর) আঁচল ফাউন্ডেশন আয়োজিত অনলাইনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

আত্মহত্যাকারীর মধ্যে ১৯৪ জন স্কুলগামী শিক্ষার্থী। ৭৬ জন কলেজপড়ুয়া, ৫০ জন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এবং ৪৪ জন মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ছিলেন।

‘বেড়েই চলেছে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার: আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া কতটা জরুরি?’ শিরোনামে সমীক্ষা তুলে ধরা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, নারায়ণগঞ্জ জেলার এডিসি (শিক্ষা ও আইসিটি ডিভিশন) আজিজুল হক মামুন এবং আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। আঁচল ফাউন্ডেশনের পক্ষে আত্মহত্যার তথ্য তুলে ধরেন ফারজানা আক্তার লাবনী।

সংবাদ সম্মেলন উত্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত আট মাসে আত্মহননকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫০ জন ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, যাদের মধ্যে পুরুষ শিক্ষার্থী ৬০ শতাংশ এবং নারী শিক্ষার্থী ৪০ শতাংশ।

কলেজ পড়ুয়াদের মধ্যে ৭৬ জন আত্মহত্যা করে। এরমধ্যে ৪৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ পুরুষ এবং ৫৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী।

সবচেয়ে বেশি ১৯৪ শতাংশ স্কুলগামী শিক্ষার্থী গত আট মাসে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩২ দশমিক ৯৯ শতাংশ পুরুষ এবং ৬৭ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী।

মাদ্রাসার শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন ৪৪ জন। এদের মধ্যে ৩৯ দশমিক ২৯ শতাংশ পুরুষ এবং ৬০ দশমিক নারী শিক্ষার্থী।

বিভাগভিত্তিক তথ্য

আত্মহত্যাকারীদের অবস্থান বিবেচনায় সবার শীর্ষে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। গত আট মাসে আত্মহননকারীদের মধ্যে ২৫ দশমিক ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ঢাকায় আত্মহত্যা করেন। এই হার চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং খুলনা বিভাগে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ।

রংপুর বিভাগে আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থী রয়েছেন ৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এছাড়া বরিশাল বিভাগে ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং রাজশাহী বিভাগে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। আর সিলেট বিভাগে তুলনামূলক কম শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, ৪ শতাংশ।

আত্মহত্যায় স্কুলগামীরা এগিয়ে

শিক্ষাস্তর বিবেচনায়, বিদ্যালয়গামী প্রাইমারি থেকে মাধ্যমিকের ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যা করেছেন ৫৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। আত্মহত্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কলেজের শিক্ষার্থী, ২০ দশমিক ৮৮ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থী রয়েছে ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ। আত্মহননকারীদের মধ্যে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী শতকরা ১২ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।

নারীরা বেশি আত্মহত্যা করেছে

তথ্যানুসারে দেখা যায়, আত্মহত্যা বেশি করেছেন নারী শিক্ষার্থীরা, যা মোট সংখ্যার ৬০ দশমিক ৭১ শতাংশ বা ২২১ জন। অন্যদিকে পুরুষ শিক্ষার্থী রয়েছেন ৩৯ দশমিক ২৯ শতাংশ বা ১৪৩ জন।

বয়সভিত্তিক আত্মহত্যার হার

১৩ থেকে ২০ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার সর্বাধিক, ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ। ২১ থেকে ২৬ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ অর্থাৎ ২৯ জন আত্মহত্যা করেছেন।  তবে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছে ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১৬০ জন। সর্বনিম্ন সাত বছরের একটি শিশুও আত্মহত্যা করেছে।

প্রেমঘটিত কারণ সবচেয়ে বেশি দায়ী

আত্মহত্যার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অভিমান, প্রেমঘটিত কারণ, সেশনজট, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, পড়াশোনার চাপ, পরিবার থেকে কিছু চেয়ে না পাওয়া, পারিবারিক কলহ, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি, চুরি বা মিথ্যা অপবাদ, মানসিক সমস্যা, বিয়েতে প্রত্যাখ্যাত, স্বামী পছন্দ না হওয়া, বাসা থেকে মোটরবাইক কিনে না দেওয়া ইত্যাদি। আরও রয়েছে মানসিক ভারসাম্যহীনতা, বিষণ্ণতা, বন্ধুর মৃত্যু, আর্থিক সমস্যা।

বলা হচ্ছে, প্রেমঘটিত কারণে আত্মহত্যা করেছে ২৫ দশমিক ২৭ শতাংশ, অভিমান করে ২৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। পরিবারের সঙ্গে চাওয়া পাওয়ার অমিল হওয়ায় ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং পারিবারিক কলহের কারণে ৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ আত্মহত্যা করেছেন।

আঁচল ফাউন্ডেশনের সমীক্ষায় আরও দাবি করা হচ্ছে, ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় ৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। মানসিক সমস্যার কারণে ৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। পড়াশোনার চাপে শূন্য দশমিক ৮২ শতাংশ, সেশনজটের কারণে হতাশায় শূন্য দশমিক ৮২ শতাংশ এবং পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ আত্মহত্যা করেছে। মিথ্যা চুরির অপবাদে ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ, আর্থিক সমস্যায় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ, বন্ধুর মৃত্যুতে শূন্য দশমিক ৫৫ শতাংশ, বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় এবং স্বামী পছন্দ না হওয়ায় ১ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে ১৫ দশমিক ৯৩ শতাংশের আত্মহননের কারণ জানা যায়নি।

আত্মহত্যার ভিন্ন কিছু দিকের মধ্যে রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সাইবারক্রাইম, আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও মোবাইলে ধারণের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলের শিকার।

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা প্রতিরোধ ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রস্তাবনা

১) আত্মহত্যা মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন।

২) পাঠ্যপুস্তকে মানসিক শিক্ষাকে এবং মনের যত্নের কৌশলগুলো শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা।

৩) স্কুল-কলেজের অভিভাবক সমাবেশের আলোচিত সূচিতে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যা সম্পর্কিত এজেন্ডা রাখতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা প্রদান।

৪) মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও আত্মহত্যা প্রতিরোধে সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা।

৫) প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রদান।

৬) সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা

৭) মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা।

৮) হতাশা, আপত্তিকর ছবি, আত্মহত্যার লাইভ স্ট্রিমিং, জীবননাশের পোস্ট ইত্যাদি চিহ্নিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ টুলস ব্যবহার করা।

৯) আত্মহত্যার ঘটনায় পরিবার ও পরিচিতজনদের দায় অনুসন্ধানে আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা।

১০) মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত ও সহজলভ্য করতে একটি টোল-ফ্রি জাতীয় হটলাইন নম্বর চালু করা।

 

এই বিভাগের আরও খবর
Advertisements
×portlink